ঢাকা ০২:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

গ্যাস সংকটে দেশের সার উৎপাদন ব্যাহত: বোরো মৌসুমে আমদানি নির্ভরতার আশঙ্কা

দেশে খাদ্য উৎপাদনের প্রধান মৌসুম বোরো আবাদের আগে অভ্যন্তরীণ সার কারখানাগুলোতে উৎপাদন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দেশের মোট রাসায়নিক সারের ৭০ শতাংশের বেশি ব্যবহৃত হয় এই বোরো মৌসুমে, যার সিংহভাগই ইউরিয়া। তবে দেশের একমাত্র ইউরিয়া উৎপাদন ও সরবরাহকারী সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) জানিয়েছে, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে তাদের আওতাধীন পাঁচটি কারখানার উৎপাদন বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় আশুগঞ্জ সার কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে এবং ঘোড়াশাল পলাশ, শাহজালাল, যমুনা ও চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমও সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিসিআইসি সম্প্রতি অর্থ, জ্বালানি, শিল্প ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছে, তাদের চারটি কারখানায় বছরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৮ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদনের জন্য দৈনিক ১৯৭ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট (এমএমসিএফ) গ্যাসের প্রয়োজন। কিন্তু পেট্রোবাংলা গ্যাসের দাম ইউনিট প্রতি ১৩ টাকার বেশি বাড়িয়ে দিলেও দৈনিক গড়ে মাত্র ১৪০ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে।

সংস্থাটির দাবি, পেট্রোবাংলার এই প্রস্তাবিত গ্যাস দিয়ে সর্বোচ্চ দুটি কারখানা সচল রাখা সম্ভব। বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হলেও বোরো মৌসুমে সারের সংকট হতে দেওয়া হবে না। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন না হলে সরকার আমদানির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করবে। তিনি আরও আশ্বস্ত করেছেন যে, গ্যাসের দাম বাড়লেও সরকারি ভর্তুকির কারণে কৃষকদের অতিরিক্ত মূল্যে সার কিনতে হবে না।

বর্তমানে দেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ৩০ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি, যার মধ্যে কেবল বোরো আবাদের জন্যই প্রয়োজন প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। বিসিআইসি দেশের কারখানাগুলোর মাধ্যমে ১৮ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য রাখলেও গ্যাস সংকটের কারণে প্রতি বছর গড়ে মাত্র ৮ থেকে ১১ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদিত হয়। ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছর সৌদি আরব, কানাডা ও মরক্কো থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে সার আমদানি করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি এলএনজি আমদানির মাধ্যমে কারখানাগুলো সচল রাখার এবং গ্যাসের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।

সূত্রমতে, গত নভেম্বর মাসে সার কারখানার জন্য গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯ দশমিক ২৫ টাকা করা হয়। দাম বাড়ার পরও পেট্রোবাংলা প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে অনেক কম গ্যাস সরবরাহের কথা বলায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বোরো মৌসুমে খাদ্য উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে দেশীয় উৎপাদনের পরিবর্তে আবারও আমদানিনির্ভর হতে হবে, যা অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের ওয়ানডে জয়ে বাংলাদেশের সৈকত, আইসিসি চুক্তিতে নেই বিসিবির বাধা

গ্যাস সংকটে দেশের সার উৎপাদন ব্যাহত: বোরো মৌসুমে আমদানি নির্ভরতার আশঙ্কা

আপডেট সময় : ০৫:৩৩:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

দেশে খাদ্য উৎপাদনের প্রধান মৌসুম বোরো আবাদের আগে অভ্যন্তরীণ সার কারখানাগুলোতে উৎপাদন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দেশের মোট রাসায়নিক সারের ৭০ শতাংশের বেশি ব্যবহৃত হয় এই বোরো মৌসুমে, যার সিংহভাগই ইউরিয়া। তবে দেশের একমাত্র ইউরিয়া উৎপাদন ও সরবরাহকারী সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) জানিয়েছে, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে তাদের আওতাধীন পাঁচটি কারখানার উৎপাদন বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় আশুগঞ্জ সার কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে এবং ঘোড়াশাল পলাশ, শাহজালাল, যমুনা ও চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমও সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিসিআইসি সম্প্রতি অর্থ, জ্বালানি, শিল্প ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছে, তাদের চারটি কারখানায় বছরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৮ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদনের জন্য দৈনিক ১৯৭ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট (এমএমসিএফ) গ্যাসের প্রয়োজন। কিন্তু পেট্রোবাংলা গ্যাসের দাম ইউনিট প্রতি ১৩ টাকার বেশি বাড়িয়ে দিলেও দৈনিক গড়ে মাত্র ১৪০ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে।

সংস্থাটির দাবি, পেট্রোবাংলার এই প্রস্তাবিত গ্যাস দিয়ে সর্বোচ্চ দুটি কারখানা সচল রাখা সম্ভব। বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হলেও বোরো মৌসুমে সারের সংকট হতে দেওয়া হবে না। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন না হলে সরকার আমদানির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করবে। তিনি আরও আশ্বস্ত করেছেন যে, গ্যাসের দাম বাড়লেও সরকারি ভর্তুকির কারণে কৃষকদের অতিরিক্ত মূল্যে সার কিনতে হবে না।

বর্তমানে দেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ৩০ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি, যার মধ্যে কেবল বোরো আবাদের জন্যই প্রয়োজন প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। বিসিআইসি দেশের কারখানাগুলোর মাধ্যমে ১৮ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য রাখলেও গ্যাস সংকটের কারণে প্রতি বছর গড়ে মাত্র ৮ থেকে ১১ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদিত হয়। ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছর সৌদি আরব, কানাডা ও মরক্কো থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে সার আমদানি করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি এলএনজি আমদানির মাধ্যমে কারখানাগুলো সচল রাখার এবং গ্যাসের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।

সূত্রমতে, গত নভেম্বর মাসে সার কারখানার জন্য গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯ দশমিক ২৫ টাকা করা হয়। দাম বাড়ার পরও পেট্রোবাংলা প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে অনেক কম গ্যাস সরবরাহের কথা বলায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বোরো মৌসুমে খাদ্য উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে দেশীয় উৎপাদনের পরিবর্তে আবারও আমদানিনির্ভর হতে হবে, যা অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।