ঢাকা ০২:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

শীতের দাপটে জবুথবু ঢাকা, বাড়ছে শীতার্তদের আর্তনাদ

তিনি আরও বলেন, ‘দুপুরের দিকে একটু রোদ উঠলে স্বস্তি পাই, কিন্তু বিকেল নামলেই আবার ঠান্ডা বাড়ে। গরম কাপড় বলতে একটা পুরোনো জ্যাকেট আর পাতলা কম্বল, এগুলো দিয়ে পুরো শীত পার করা কঠিন। রাতে বাসায় ফিরেও ঠিকমতো ঘুম হয় না। শীতে শরীর ব্যথা করে, জ্বর-কাশি লেগেই থাকে। সরকারের বা সমাজের কেউ যদি আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করত, তাহলে অনেক উপকার হতো। শীত শুধু ঠান্ডা না, আমাদের জন্য এটা টিকে থাকার লড়াই।’

মিরপুর এলাকায় ফুটপাতে বাসবাস করেন বৃদ্ধা রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে, এই শীত শরীর আর সইতে পারে না। ফুটপাতে থাকি বলে ঠান্ডা সরাসরি গায়ে লাগে। রাতে ঘুমাতে গেলে মনে হয় হাড় ভেঙে যাবে। একটা পুরোনো শাল (চাদর) আছে, সেটাও পুরো শরীর ঢাকে না। অনেক সময় কুয়াশার মধ্যে সারারাত জেগে কাটে। আশপাশে গাড়ির শব্দ, ঠান্ডা বাতাস-সব মিলিয়ে খুব ভয় লাগে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই। শীতে জ্বর-কাশি বাড়ে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মানুষ মাঝে মাঝে খাবার দেয়, কিন্তু গরম কাপড় খুব কমই পাওয়া যায়। এই বয়সে সবচেয়ে বেশি দরকার একটু উষ্ণতা আর নিরাপত্তা। যদি রাতে থাকার মতো কোনো আশ্রয় থাকত, তাহলে এত কষ্ট হতো না। শীত আসলেই আমাদের কষ্ট দ্বিগুণ হয়ে যায়।’

পোশাকশ্রমিক শিউলি আক্তার বলেন, ‘শীত মানেই আমাদের কাজের চাপের সঙ্গে কষ্টও বাড়ে। সকালে খুব ভোরে বাসা থেকে বের হতে হয়। কুয়াশা আর ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করা সবচেয়ে কঠিন। বাসে ভিড় বেশি থাকে, জানালা খোলা থাকলে ঠান্ডা আরও লাগে। কারখানার ভেতরেও অনেক সময় গরমের ব্যবস্থা ঠিক থাকে না। কাজ করতে করতে হাত শক্ত হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘শীতের কাপড় থাকলেও সারাদিন কাজ করলে শরীর গরম থাকে না। শীতে অসুস্থ হলে ছুটি নেওয়া কঠিন, কারণ ছুটি মানেই মজুরি কাটা। অনেক সহকর্মী জ্বর-কাশি নিয়ে কাজ করছে। এই সময় যদি কারখানাগুলো গরম পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ আর শীতের উপযোগী ব্যবস্থা করত, তাহলে শ্রমিকদের কষ্ট কমত। শীত শুধু আবহাওয়ার বিষয় না, এটা আমাদের জীবনের বাস্তব লড়াই।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে হাওর–অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জের নিকলীতে—৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া উত্তরের জেলা সিরাজগঞ্জের তাড়াশে তাপমাত্রা নেমেছে ১১ ডিগ্রিতে, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১১ দশমিক ৩, কুমিল্লা ও যশোরে ১১ দশমিক ৫, পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ১১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও নীলফামারীর ডিমলায় ১২, কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও নওগাঁর বদলগাছীতে ১২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা নগরবাসীর জন্যও তীব্র শীতের অনুভূতি তৈরি করেছে।

ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাসের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। দেশের অনেক এলাকায় সকালবেলায় সড়ক, নৌ ও আকাশপথে যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটছে। নৌপথে লঞ্চ ও ফেরি চলাচল ধীর হয়ে পড়েছে, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হচ্ছে। বিমানবন্দরগুলোতেও কুয়াশার কারণে ফ্লাইট শিডিউলে বিঘ্ন দেখা দিচ্ছে। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে, তাই চালকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শীতের এই তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও খোলা জায়গায় বসবাসকারী ছিন্নমূল মানুষদের জন্য শীত এখন বড় এক সংকট। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় শীতজনিত রোগ—সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর শৈত্যপ্রবাহের সংজ্ঞা অনুযায়ী জানিয়েছে, বড় এলাকাজুড়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তাকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি এবং ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। বর্তমানে দেশের কিছু অংশে মৃদু থেকে হালকা শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তবে রাতের তাপমাত্রা আরও ১ থেকে ২ ডিগ্রি কমলে পরিস্থিতি মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে রূপ নিতে পারে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মধ্যরাত থেকে দুপুর পর্যন্ত কুয়াশার দাপট বেশি থাকছে। নদী অববাহিকা ও নিম্নাঞ্চলে কুয়াশার ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি, যার প্রভাব পড়ছে নৌযানে চলাচলে। আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানার সই করা বুলেটিনে বলা হয়েছে, সোমবার রাত ও দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। মঙ্গলবার রাতে তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে, তবে দিনের তাপমাত্রা খুব একটা বদলাবে না। বুধবার বছরের শেষ দিনে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমে শীতের অনুভূতি আরও বাড়তে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির শুরু পর্যন্ত শীতের তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানুয়ারিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যেতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, হাওর এলাকা ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে শীতের প্রকোপ বেশি হতে পারে। এতে দরিদ্র ও খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়বে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শীতজনিত ঝুঁকি এড়াতে শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। শীতে পর্যাপ্ত গরম কাপড় ব্যবহার, ভোরে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া এবং গরম খাবার গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্বাসকষ্ট বা জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে নতুন বছরের শুরুতে তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কুয়াশা পুরোপুরি কাটতে সময় লাগতে পারে। বিআইডব্লিউটিএ ও হাইওয়ে পুলিশ কুয়াশার মধ্যে চলাচলের সময় হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে চলার নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে শীতবস্ত্র বিতরণ ও শীতকালীন প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীতের ধরন বদলে যাচ্ছে। কখনো স্বল্প সময়ের মধ্যে তীব্র ঠান্ডা, আবার কখনো দীর্ঘ সময় ধরে কুয়াশাচ্ছন্ন ও শুষ্ক আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আগাম প্রস্তুতি ও সচেতনতা জরুরি। শীতের এই হাড়কাঁপানো সময়ে জনজীবনকে স্বাভাবিক রাখতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের ওয়ানডে জয়ে বাংলাদেশের সৈকত, আইসিসি চুক্তিতে নেই বিসিবির বাধা

শীতের দাপটে জবুথবু ঢাকা, বাড়ছে শীতার্তদের আর্তনাদ

আপডেট সময় : ০১:২৩:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

তিনি আরও বলেন, ‘দুপুরের দিকে একটু রোদ উঠলে স্বস্তি পাই, কিন্তু বিকেল নামলেই আবার ঠান্ডা বাড়ে। গরম কাপড় বলতে একটা পুরোনো জ্যাকেট আর পাতলা কম্বল, এগুলো দিয়ে পুরো শীত পার করা কঠিন। রাতে বাসায় ফিরেও ঠিকমতো ঘুম হয় না। শীতে শরীর ব্যথা করে, জ্বর-কাশি লেগেই থাকে। সরকারের বা সমাজের কেউ যদি আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করত, তাহলে অনেক উপকার হতো। শীত শুধু ঠান্ডা না, আমাদের জন্য এটা টিকে থাকার লড়াই।’

মিরপুর এলাকায় ফুটপাতে বাসবাস করেন বৃদ্ধা রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে, এই শীত শরীর আর সইতে পারে না। ফুটপাতে থাকি বলে ঠান্ডা সরাসরি গায়ে লাগে। রাতে ঘুমাতে গেলে মনে হয় হাড় ভেঙে যাবে। একটা পুরোনো শাল (চাদর) আছে, সেটাও পুরো শরীর ঢাকে না। অনেক সময় কুয়াশার মধ্যে সারারাত জেগে কাটে। আশপাশে গাড়ির শব্দ, ঠান্ডা বাতাস-সব মিলিয়ে খুব ভয় লাগে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই। শীতে জ্বর-কাশি বাড়ে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মানুষ মাঝে মাঝে খাবার দেয়, কিন্তু গরম কাপড় খুব কমই পাওয়া যায়। এই বয়সে সবচেয়ে বেশি দরকার একটু উষ্ণতা আর নিরাপত্তা। যদি রাতে থাকার মতো কোনো আশ্রয় থাকত, তাহলে এত কষ্ট হতো না। শীত আসলেই আমাদের কষ্ট দ্বিগুণ হয়ে যায়।’

পোশাকশ্রমিক শিউলি আক্তার বলেন, ‘শীত মানেই আমাদের কাজের চাপের সঙ্গে কষ্টও বাড়ে। সকালে খুব ভোরে বাসা থেকে বের হতে হয়। কুয়াশা আর ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করা সবচেয়ে কঠিন। বাসে ভিড় বেশি থাকে, জানালা খোলা থাকলে ঠান্ডা আরও লাগে। কারখানার ভেতরেও অনেক সময় গরমের ব্যবস্থা ঠিক থাকে না। কাজ করতে করতে হাত শক্ত হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘শীতের কাপড় থাকলেও সারাদিন কাজ করলে শরীর গরম থাকে না। শীতে অসুস্থ হলে ছুটি নেওয়া কঠিন, কারণ ছুটি মানেই মজুরি কাটা। অনেক সহকর্মী জ্বর-কাশি নিয়ে কাজ করছে। এই সময় যদি কারখানাগুলো গরম পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ আর শীতের উপযোগী ব্যবস্থা করত, তাহলে শ্রমিকদের কষ্ট কমত। শীত শুধু আবহাওয়ার বিষয় না, এটা আমাদের জীবনের বাস্তব লড়াই।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে হাওর–অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জের নিকলীতে—৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া উত্তরের জেলা সিরাজগঞ্জের তাড়াশে তাপমাত্রা নেমেছে ১১ ডিগ্রিতে, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১১ দশমিক ৩, কুমিল্লা ও যশোরে ১১ দশমিক ৫, পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ১১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও নীলফামারীর ডিমলায় ১২, কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও নওগাঁর বদলগাছীতে ১২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা নগরবাসীর জন্যও তীব্র শীতের অনুভূতি তৈরি করেছে।

ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাসের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। দেশের অনেক এলাকায় সকালবেলায় সড়ক, নৌ ও আকাশপথে যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটছে। নৌপথে লঞ্চ ও ফেরি চলাচল ধীর হয়ে পড়েছে, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হচ্ছে। বিমানবন্দরগুলোতেও কুয়াশার কারণে ফ্লাইট শিডিউলে বিঘ্ন দেখা দিচ্ছে। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে, তাই চালকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শীতের এই তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও খোলা জায়গায় বসবাসকারী ছিন্নমূল মানুষদের জন্য শীত এখন বড় এক সংকট। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় শীতজনিত রোগ—সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর শৈত্যপ্রবাহের সংজ্ঞা অনুযায়ী জানিয়েছে, বড় এলাকাজুড়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তাকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি এবং ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। বর্তমানে দেশের কিছু অংশে মৃদু থেকে হালকা শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তবে রাতের তাপমাত্রা আরও ১ থেকে ২ ডিগ্রি কমলে পরিস্থিতি মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে রূপ নিতে পারে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মধ্যরাত থেকে দুপুর পর্যন্ত কুয়াশার দাপট বেশি থাকছে। নদী অববাহিকা ও নিম্নাঞ্চলে কুয়াশার ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি, যার প্রভাব পড়ছে নৌযানে চলাচলে। আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানার সই করা বুলেটিনে বলা হয়েছে, সোমবার রাত ও দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। মঙ্গলবার রাতে তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে, তবে দিনের তাপমাত্রা খুব একটা বদলাবে না। বুধবার বছরের শেষ দিনে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমে শীতের অনুভূতি আরও বাড়তে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির শুরু পর্যন্ত শীতের তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানুয়ারিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যেতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, হাওর এলাকা ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে শীতের প্রকোপ বেশি হতে পারে। এতে দরিদ্র ও খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়বে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শীতজনিত ঝুঁকি এড়াতে শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। শীতে পর্যাপ্ত গরম কাপড় ব্যবহার, ভোরে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া এবং গরম খাবার গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্বাসকষ্ট বা জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে নতুন বছরের শুরুতে তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কুয়াশা পুরোপুরি কাটতে সময় লাগতে পারে। বিআইডব্লিউটিএ ও হাইওয়ে পুলিশ কুয়াশার মধ্যে চলাচলের সময় হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে চলার নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে শীতবস্ত্র বিতরণ ও শীতকালীন প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীতের ধরন বদলে যাচ্ছে। কখনো স্বল্প সময়ের মধ্যে তীব্র ঠান্ডা, আবার কখনো দীর্ঘ সময় ধরে কুয়াশাচ্ছন্ন ও শুষ্ক আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আগাম প্রস্তুতি ও সচেতনতা জরুরি। শীতের এই হাড়কাঁপানো সময়ে জনজীবনকে স্বাভাবিক রাখতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।