বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ নিয়ে জাতীয় সংসদে এক নাটকীয় ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চলমান প্রথম অধিবেশনে গত শুক্রবার পর্যন্ত ১২০টি অধ্যাদেশের নিষ্পত্তি করা হলেও এর মধ্যে ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি দল এসব অধ্যাদেশকে আরও যুগোপযোগী করে পুনরায় বিল আকারে আনার আশ্বাস দিলেও বিরোধী দল বিষয়টিকে ‘ফ্যাসিবাদ পুনর্জন্মের সুযোগ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বিএনপি যেসব সংস্কার ও অধ্যাদেশের পক্ষে জোরালো প্রচার চালিয়েছিল, ক্ষমতায় আসার পর সেগুলোর বিলে রূপান্তর না করে বাতিল করা দলটির অবস্থানের বড় ধরনের পরিবর্তন বা ইউ-টার্ন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, পুলিশ কমিশন এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সমঝোতা ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংসদের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে ১২০টি অধ্যাদেশের সুরাহা হলেও গণভোট ও দুদকের মতো স্পর্শকাতর ১৩টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে কোনো আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়নি। এতে করে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া অনেক কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করা হলেও নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকদের স্বার্থে কিছু কার্যক্রমের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তবে বিএনপি নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে থাকলেও সংসদে সেই অধ্যাদেশ পাসে অনীহা দেখানোয় রাজনৈতিক মহলে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলোর মধ্যে থাকা সমঝোতা ভেঙে সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধন অধ্যাদেশ ও জুলাই অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল পাসের প্রক্রিয়া নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে চরম অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, সরকারি দল রাজনৈতিক সমঝোতা ভঙ্গ করে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে।
অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভক্তির পরিকল্পনা থেকেও সরে এসেছে বর্তমান সরকার, যা এনবিআর কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে একটি স্বস্তির খবর হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় দুদক পুনরায় তার পুরোনো আইনি কাঠামোতে ফিরে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলো আইনে পরিণত না করা সরকারের জন্য শোভন হয়নি এবং এর ফলে ভবিষ্যতে বিএনপির দেওয়া রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর জনগণের সন্দেহ তৈরি হতে পারে। বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগামী বাজেট অধিবেশনে এই বাতিলকৃত অধ্যাদেশগুলো আরও আধুনিক ও কার্যকর বিল হিসেবে উত্থাপন করা হবে। তবে ততদিনে এই প্রশাসনিক ও আইনি শূন্যতা রাষ্ট্রযন্ত্রে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে কি না, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
রিপোর্টারের নাম 



















