প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল জাতীয় সংসদের মুলতবি অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে বিগত সরকারের আমলের ভয়াবহ দুর্নীতি ও অর্থপাচারের চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারের সমান। এই বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারকে দেশের অর্থনীতির জন্য ‘গুরুতর চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
তিনি জানান, পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ইতোমধ্যে ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ এবং এইচবিএম ইকবালের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব মামলায় পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আইনি কার্যক্রম অত্যন্ত জোরালোভাবে শুরু হয়েছে।
অর্থপাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চীনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে ইতোমধ্যে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (MLAT) সই হয়েছে এবং বাকি সাতটি দেশের সাথে চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং ১১টি যৌথ তদন্ত দল (JIT) অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলোর অগ্রগতি তদারকি করছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে মোট ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে জব্দ সম্পদের পরিমাণ ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে এ পর্যন্ত ১৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫টিতে চার্জশিট এবং ৬টি মামলায় রায় হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, সরকার জোরজবরদস্তি নয়, বরং প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই বিচার নিশ্চিত করবে। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী চার বছরে ৪ কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার এক সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। এই কর্মসূচির আওতায় পরিবারের প্রধান নারী সদস্যের নামে কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়া কৃষি খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ, ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উন্নয়নের পরিকল্পনাও তিনি সংসদে পেশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ থেকে স্পষ্ট যে, সরকার একদিকে যেমন পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনি কাঠামো শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের পথে হাঁটছে।
রিপোর্টারের নাম 

























