ঢাকা ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

জাতীয় সংসদ ও রাজনীতির মাঠ নারীশূন্য: চার দশকের আধিপত্য শেষে নেতৃত্বে খরা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৫০:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
  • ২০ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত চার দশক ধরে সরকারপ্রধান এবং প্রধান দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে নারীদের যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেখানে এক নজিরবিহীন শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আমৃত্যু বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়া বেগম খালেদা জিয়া এবং ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশের বাইরে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় স্তম্ভকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

এছাড়া জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ বার্ধক্যের কারণে নিষ্ক্রিয়, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পলাতক এবং সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও মতিয়া চৌধুরীর মতো অভিজ্ঞ নেত্রীদের মৃত্যুতে সংসদ ও রাজপথ এখন প্রায় নারীশূন্য। অতীতে যারা দরাজ কণ্ঠে সংসদ কাঁপাতেন এবং রাজপথের উত্তাল সময়ে সামনের সারিতে থাকতেন, তাদের জায়গায় এখন পুরুষ নেতৃত্বের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদে বিজয়ী হয়ে আসা নারী নেত্রীদের সংখ্যাও অত্যন্ত নগণ্য এবং যারা এসেছেন তাদের বেশিরভাগই বাবা বা স্বামীর পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো আনুপাতিক হারে নারীদের মনোনয়ন না দেওয়া এবং তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব উঠে আসার পথ সংকুচিত হওয়াই এই সংকটের মূল কারণ।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান তিনটি দল—বিএনপি, জামায়াত এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্বে এখন পুরুষরা রয়েছেন। বিএনপি থেকে ১০ জন নারী মনোনয়ন পেলেও বিজয়ী হয়েছেন মাত্র ৬ জন; তারা হলেন আফরোজা খান রিতা, ইশরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, তাহসিনা রুশদীর লুনা, শামা ওবায়েদ, নায়ার ইউসুফ কামাল এবং ফারজানা শারমিন পুতুল। দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী হয়েছেন সাবেক আলোচিত এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, তবে সংসদে তিনি এখনো আগের মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি।

অন্যদিকে জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো কোনো নারীকে সরাসরি মনোনয়ন দেয়নি এবং নতুন দল এনসিপির ৩ জন নারী প্রার্থীর কেউই জয়লাভ করতে পারেননি। এই পরিস্থিতির কারণ হিসেবে সিপিবি নেত্রী লাকী আক্তার মনে করেন, দেশে নারীবিদ্বেষের বিস্তার, উগ্র দক্ষিণপন্থি শক্তির আস্ফালন এবং সংগঠনের অভ্যন্তরে বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নারীদের নেতৃত্বে উঠে আসার পথ সংকুচিত করছে। এছাড়া সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতা ও সাইবার বুলিং নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করছে যা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজপথ থেকেও আগের মতো লড়াকু নারী নেতৃত্ব উঠে আসছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অতীতে সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী বা তারানা হালিমের মতো নেত্রীরা ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এলেও বর্তমান সময়ে সেই ধারাটি স্তিমিত। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ক্যারিয়ারসম্পন্ন নারী নেতৃত্বের অভাব দীর্ঘদিনের এবং বর্তমানে যারা নেতৃত্বে আসছেন তাদের বেশিরভাগই পারিবারিক বৃত্ত থেকে আসা। তিনি মনে করেন, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক উদীয়মান নেত্রী হারিয়ে যাচ্ছেন। এর সমাধানে তারা ‘জনতার স্কুল’ নামে একটি পাইলটিং প্রকল্প গ্রহণ করেছেন।

অন্যদিকে মহিলা জামায়াতের নেত্রী প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ মনে করেন, নারীদের নিজেদের পরিচয়ে অবস্থান তৈরির মানসিকতা থাকতে হবে এবং দলগুলোকে আরও নারীবান্ধব হতে হবে। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহাম্মেদ দাবি করেন, বিএনপি সবসময়ই নারীবান্ধব এবং খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে নারীদের আরও সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর লড়াকু ঐতিহ্য ধরে রাখতে তৃণমূল পর্যায়ে পরিকল্পিত কাজ এবং কাঠামোগত বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধে মার্কিনদের সমর্থন হ্রাস: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তলানিতে

জাতীয় সংসদ ও রাজনীতির মাঠ নারীশূন্য: চার দশকের আধিপত্য শেষে নেতৃত্বে খরা

আপডেট সময় : ১১:৫০:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত চার দশক ধরে সরকারপ্রধান এবং প্রধান দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে নারীদের যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেখানে এক নজিরবিহীন শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আমৃত্যু বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়া বেগম খালেদা জিয়া এবং ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশের বাইরে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় স্তম্ভকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

এছাড়া জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ বার্ধক্যের কারণে নিষ্ক্রিয়, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পলাতক এবং সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও মতিয়া চৌধুরীর মতো অভিজ্ঞ নেত্রীদের মৃত্যুতে সংসদ ও রাজপথ এখন প্রায় নারীশূন্য। অতীতে যারা দরাজ কণ্ঠে সংসদ কাঁপাতেন এবং রাজপথের উত্তাল সময়ে সামনের সারিতে থাকতেন, তাদের জায়গায় এখন পুরুষ নেতৃত্বের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদে বিজয়ী হয়ে আসা নারী নেত্রীদের সংখ্যাও অত্যন্ত নগণ্য এবং যারা এসেছেন তাদের বেশিরভাগই বাবা বা স্বামীর পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো আনুপাতিক হারে নারীদের মনোনয়ন না দেওয়া এবং তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব উঠে আসার পথ সংকুচিত হওয়াই এই সংকটের মূল কারণ।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান তিনটি দল—বিএনপি, জামায়াত এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্বে এখন পুরুষরা রয়েছেন। বিএনপি থেকে ১০ জন নারী মনোনয়ন পেলেও বিজয়ী হয়েছেন মাত্র ৬ জন; তারা হলেন আফরোজা খান রিতা, ইশরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, তাহসিনা রুশদীর লুনা, শামা ওবায়েদ, নায়ার ইউসুফ কামাল এবং ফারজানা শারমিন পুতুল। দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী হয়েছেন সাবেক আলোচিত এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, তবে সংসদে তিনি এখনো আগের মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি।

অন্যদিকে জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো কোনো নারীকে সরাসরি মনোনয়ন দেয়নি এবং নতুন দল এনসিপির ৩ জন নারী প্রার্থীর কেউই জয়লাভ করতে পারেননি। এই পরিস্থিতির কারণ হিসেবে সিপিবি নেত্রী লাকী আক্তার মনে করেন, দেশে নারীবিদ্বেষের বিস্তার, উগ্র দক্ষিণপন্থি শক্তির আস্ফালন এবং সংগঠনের অভ্যন্তরে বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নারীদের নেতৃত্বে উঠে আসার পথ সংকুচিত করছে। এছাড়া সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতা ও সাইবার বুলিং নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করছে যা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজপথ থেকেও আগের মতো লড়াকু নারী নেতৃত্ব উঠে আসছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অতীতে সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী বা তারানা হালিমের মতো নেত্রীরা ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এলেও বর্তমান সময়ে সেই ধারাটি স্তিমিত। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ক্যারিয়ারসম্পন্ন নারী নেতৃত্বের অভাব দীর্ঘদিনের এবং বর্তমানে যারা নেতৃত্বে আসছেন তাদের বেশিরভাগই পারিবারিক বৃত্ত থেকে আসা। তিনি মনে করেন, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক উদীয়মান নেত্রী হারিয়ে যাচ্ছেন। এর সমাধানে তারা ‘জনতার স্কুল’ নামে একটি পাইলটিং প্রকল্প গ্রহণ করেছেন।

অন্যদিকে মহিলা জামায়াতের নেত্রী প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ মনে করেন, নারীদের নিজেদের পরিচয়ে অবস্থান তৈরির মানসিকতা থাকতে হবে এবং দলগুলোকে আরও নারীবান্ধব হতে হবে। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহাম্মেদ দাবি করেন, বিএনপি সবসময়ই নারীবান্ধব এবং খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে নারীদের আরও সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর লড়াকু ঐতিহ্য ধরে রাখতে তৃণমূল পর্যায়ে পরিকল্পিত কাজ এবং কাঠামোগত বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।