ঢাকা ০১:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: শিশু মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যায় উদ্বেগ

দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এই সংকটের জন্য বিগত বছরগুলোতে টিকাদান কর্মসূচিতে শিথিলতাকে দায়ী করছেন। অনেক শিশু সময়মতো হামের টিকা না পাওয়ায় বর্তমানে এই সংক্রামক ব্যাধিটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিভাগীয় ও জেলাভিত্তিক চিত্র

দেশের বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপে চিকিৎসা সেবা হিমশিম খাচ্ছে। নিচে জেলাভিত্তিক পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:

জেলা/বিভাগবর্তমান পরিস্থিতি ও আক্রান্তের তথ্যবিশেষ ব্যবস্থা
ময়মনসিংহ৬৮ জন চিকিৎসাধীন, এ মাসে ১০৮ জন শনাক্ত ও ৫ শিশুর মৃত্যু।পৃথক ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ চালুর প্রস্তুতি।
রাজশাহী২৮০ জন চিকিৎসাধীন, ১৩৭ জন শনাক্ত। ৬৫% আক্রান্তের বয়স ৬ মাসের নিচে।শয্যা ও আইসিইউ সংকট প্রকট।
যশোর২ মাসে ২০০ শিশু আক্রান্ত, মার্চে ১০ জন শনাক্ত।সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
পাবনা১১৮ জন আক্রান্ত (জানুয়ারি-মার্চ), বর্তমানে ২৭ জন হাসপাতালে।শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন।
চট্টগ্রাম৯৫ জন শনাক্ত, ১০ দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু। কক্সবাজারে প্রকোপ বেশি।চমেক হাসপাতালে বিশেষ ‘হাম কর্নার’ চালু।
রংপুরপরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে, ৪ জন চিকিৎসাধীন।১০টি আইসিসিইউ বেড ও বিশেষ কমিটি গঠন।

উদ্বেগজনক প্রবণতা: টিকাদান ও বয়স

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আক্রান্তদের একটি বড় অংশের বয়স ১৫ মাসের নিচে, এমনকি অনেকের বয়স ৬ মাসেরও কম। সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ হামের টিকা (MR Vaccine) দেওয়া হয়। কিন্তু টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যমতে, সেখানে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশই ৬ মাসের কম বয়সী, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা ও চ্যালেঞ্জ

ময়মনসিংহ ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো বড় কেন্দ্রগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। মেঝেতে রেখেও অনেক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। অক্সিজেন সরবরাহ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। সংক্রমণ ঠেকাতে অনেক হাসপাতালে ডেঙ্গু বা অন্যান্য কর্নার বন্ধ করে সেগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে ‘হাম কর্নার’ বা ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, জ্বর এবং শরীরে লালচে দানা বা র‌্যাশ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। টিকার কার্ড হারিয়ে গেলেও বা আগের টিকা দেওয়া না থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সচেতনতা এবং সময়মতো টিকাদানই এই মহামারি থেকে শিশুদের রক্ষা করার একমাত্র উপায়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালীতে সামরিক জাহাজ প্রবেশে ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: শিশু মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যায় উদ্বেগ

আপডেট সময় : ১২:৫০:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এই সংকটের জন্য বিগত বছরগুলোতে টিকাদান কর্মসূচিতে শিথিলতাকে দায়ী করছেন। অনেক শিশু সময়মতো হামের টিকা না পাওয়ায় বর্তমানে এই সংক্রামক ব্যাধিটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিভাগীয় ও জেলাভিত্তিক চিত্র

দেশের বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপে চিকিৎসা সেবা হিমশিম খাচ্ছে। নিচে জেলাভিত্তিক পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:

জেলা/বিভাগবর্তমান পরিস্থিতি ও আক্রান্তের তথ্যবিশেষ ব্যবস্থা
ময়মনসিংহ৬৮ জন চিকিৎসাধীন, এ মাসে ১০৮ জন শনাক্ত ও ৫ শিশুর মৃত্যু।পৃথক ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ চালুর প্রস্তুতি।
রাজশাহী২৮০ জন চিকিৎসাধীন, ১৩৭ জন শনাক্ত। ৬৫% আক্রান্তের বয়স ৬ মাসের নিচে।শয্যা ও আইসিইউ সংকট প্রকট।
যশোর২ মাসে ২০০ শিশু আক্রান্ত, মার্চে ১০ জন শনাক্ত।সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
পাবনা১১৮ জন আক্রান্ত (জানুয়ারি-মার্চ), বর্তমানে ২৭ জন হাসপাতালে।শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন।
চট্টগ্রাম৯৫ জন শনাক্ত, ১০ দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু। কক্সবাজারে প্রকোপ বেশি।চমেক হাসপাতালে বিশেষ ‘হাম কর্নার’ চালু।
রংপুরপরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে, ৪ জন চিকিৎসাধীন।১০টি আইসিসিইউ বেড ও বিশেষ কমিটি গঠন।

উদ্বেগজনক প্রবণতা: টিকাদান ও বয়স

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আক্রান্তদের একটি বড় অংশের বয়স ১৫ মাসের নিচে, এমনকি অনেকের বয়স ৬ মাসেরও কম। সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ হামের টিকা (MR Vaccine) দেওয়া হয়। কিন্তু টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যমতে, সেখানে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশই ৬ মাসের কম বয়সী, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা ও চ্যালেঞ্জ

ময়মনসিংহ ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো বড় কেন্দ্রগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। মেঝেতে রেখেও অনেক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। অক্সিজেন সরবরাহ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। সংক্রমণ ঠেকাতে অনেক হাসপাতালে ডেঙ্গু বা অন্যান্য কর্নার বন্ধ করে সেগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে ‘হাম কর্নার’ বা ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, জ্বর এবং শরীরে লালচে দানা বা র‌্যাশ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। টিকার কার্ড হারিয়ে গেলেও বা আগের টিকা দেওয়া না থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সচেতনতা এবং সময়মতো টিকাদানই এই মহামারি থেকে শিশুদের রক্ষা করার একমাত্র উপায়।