পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে বিশ্বের ৬০টি দেশের গৃহীত পদক্ষেপের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে তদন্ত শুরু করার ঘোষণা বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তার জন্ম দিয়েছে। গত ১৮ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১(বি) ধারার আওতায় এই তদন্ত শুরু করেছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি প্রতিযোগী দেশ যেমন—ভিয়েতনাম, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের পাশাপাশি উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ডও রয়েছে। এই তদন্তের মূল উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের প্রবেশ ঠেকাতে কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখা। তদন্তের ফল যদি নেতিবাচক হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, আমদানি নিষেধাজ্ঞা বা বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা স্থগিত করার মতো কঠোর ‘প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা’ গ্রহণ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী ২৮ এপ্রিল একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে লিখিত মতামত জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের নেতারা এবং সরকারের বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এই তদন্ত নিয়ে এখনই বড় কোনো শঙ্কার কারণ দেখছেন না। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাত দীর্ঘ সময় ধরে সব ধরনের আন্তর্জাতিক ‘কমপ্লায়েন্স’ মেনে চলছে এবং এখানে জোরপূর্বক শ্রমের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাণিজ্য সচিব স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোতে এমন কোনো নীতি নেই যা মার্কিন বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মার্কিন বাণিজ্য নীতি যেভাবে কঠোর হচ্ছে, তাতে কিছুটা শঙ্কা থেকেই যায়।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার এই তদন্তে বাংলাদেশের নাম থাকাকে ‘অত্যন্ত বিস্ময়কর’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, জোরপূর্বক শ্রমের যে সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার, তাই বিষয়টিকে কেবল আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে ‘ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের’ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে কৌশলগত আলোচনার দিকে এগোতে হবে। অন্যদিকে, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, তাঁরা স্বচ্ছভাবেই ব্যবসা করছেন এবং তদন্তকে স্বাগত জানান। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক শুল্ক আরোপের প্রবণতা মাথায় রেখে সরকারকে দ্রুত অংশীজনদের সাথে বসে কার্যকর কৌশল নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর কয়েক দফায় শুল্ক বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত করেছিল, যা দীর্ঘ আলোচনার পর বর্তমানে ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নতুন এই তদন্ত প্রক্রিয়াটি মূলত মার্কিন বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইএলও কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক শ্রম বিধি-বিধানগুলোর পূর্ণ অনুসরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার মাধ্যমেই এই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ গ্রুপ তৈরির পরিকল্পনা করছে, যারা ইউএসটিআর-এর জিজ্ঞাসার জবাব দেবে এবং বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবে। সার্বিকভাবে, এই তদন্ত সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা না হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য এটি একটি বড় নীতিগত পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 
























