রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ সত্ত্বেও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও অস্থিরতা শুরু হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম প্রায় ১ টাকা বেড়ে ১২৩ টাকা ৩০ পয়সায় পৌঁছেছে। একইসঙ্গে খোলা বাজারে বা মানি এক্সচেঞ্জ হাউসে ডলারের দর ১২৬ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত উঠতে দেখা গেছে।
ডলারের দর বৃদ্ধির মূল কারণসমূহ
- মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে—এই আশঙ্কা থেকে ব্যাংকগুলো ডলার সংরক্ষণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন অবস্থান: বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে বাজারে ডলারের দামে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না এবং রিজার্ভ ধরে রাখার লক্ষ্যে বাজার থেকে ডলার কেনা বন্ধ রেখেছে। ফলে বাজারে ডলারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে দাম বাড়তে শুরু করেছে।
- বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি: চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩.৮০ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বেশি। রপ্তানি আয় সামান্য কমলেও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই চাপ তৈরি হয়েছে।
আমদানিকারক ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
ডলারের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী ও আমদানিকারকদের ওপর। এলসি (ঋণপত্র) খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো এখন ১২৩ টাকা পর্যন্ত দর চাইছে। এমনকি ‘ফরওয়ার্ড সেল’ বা ভবিষ্যৎ চুক্তির ক্ষেত্রে এই দাম আরও বেশি রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন:
পণ্যমূল্য বৃদ্ধি: ডলারের দাম বাড়লে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও নিত্যপণ্যের ব্যয় বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে সাধারণ ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
জ্বালানি ঝুঁকি: পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এক মাসের বেশি স্থায়ী হলে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
ব্যাংকভেদে ডলারের বর্তমান চিত্র (১৫ মার্চ ২০২৬ অনুযায়ী)
| ব্যাংকের নাম | বিক্রয় মূল্য (টাকা) | ক্রয় মূল্য (টাকা) |
| সোনালী ব্যাংক | ১২২.৭৫ | ১২১.৬৮ – ১২১.৮০ |
| ব্র্যাক ব্যাংক | ১২২.৯৫ | ১২১.৯৫ |
| ঢাকা ব্যাংক | ১২২.৯৯ | ১২১.৫০ |
| মার্কেন্টাইল ব্যাংক | ১২২.৯০ | ১২১.৬০ |
| মানি এক্সচেঞ্জ (খোলা বাজার) | ১২৬.৮০ | – |
আশার আলো: শক্তিশালী রেমিট্যান্স
বাজার অস্থির হলেও রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ১৯.৪৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের ১৫.৯৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক বেশি। এই শক্তিশালী প্রবাহ দেশের ‘কারেন্ট অ্যাকাউন্ট’ বা চলতি হিসাবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করেছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় বাণিজ্য ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 























