ঢাকা ১২:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬

৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী খনিয়াদিঘি মসজিদ: ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অনবদ্য নিদর্শন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামের প্রাচীন জান্নাতবাদ নগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত খনিয়াদিঘি মসজিদ বাংলাদেশের এক অমূল্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো এই মসজিদটি শুধু ইতিহাসপ্রেমীদের কাছেই নয়, বরং প্রকৃতি ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এক বিশেষ আকর্ষণ। স্থানীয়ভাবে এটি রাজবিবি মসজিদ, খঞ্জনদিঘি মসজিদ বা চামচিকা মসজিদ নামেও পরিচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থানটিতে বাস, মাইক্রোবাস, সিএনজি বা অটোরিকশার মতো সহজলভ্য যানবাহনে যাতায়াত করা যায়।

মসজিদের নির্মাণকাল সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট শিলালিপি না থাকলেও, এর স্থাপত্যশৈলী ও অলঙ্করণ রীতির ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হয় যে এটি ইলিয়াস শাহী বংশের দ্বিতীয় পর্বে, আনুমানিক ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে নির্মিত হয়েছিল। পুরো ইমারতটি ইট ও পাথরের সমন্বয়ে নির্মিত, যা এর দীর্ঘস্থায়ীত্বের পরিচায়ক। মসজিদের কেন্দ্রে রয়েছে ৯ মিটার পার্শ্ববিশিষ্ট একটি বর্গাকার নামাজ কক্ষ, যার পূর্বদিকে রয়েছে ৯ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি বারান্দা। নামাজ কক্ষের উপরে অবস্থিত বিশাল গোলাকার গম্বুজটি এর স্থাপত্যিক সৌন্দর্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বারান্দার উপরে শোভা পাচ্ছে আরও তিনটি ছোট আকারের গম্বুজ, যা বাংলার গম্বুজ স্থাপত্যের এক সমৃদ্ধ উদাহরণ।

নামাজ কক্ষের অভ্যন্তরে তিনটি মিহরাব রয়েছে, যার মধ্যে মধ্যবর্তী মিহরাবটি তুলনামূলকভাবে বড় এবং সামনের দিকে প্রসারিত, যা এর গুরুত্ব নির্দেশ করে। পাশের দুটি মিহরাব অপেক্ষাকৃত ছোট ও সরল নকশার। কেবলা দেয়ালের ভেতরের অংশ গ্রানাইট পাথরের খণ্ডে আচ্ছাদিত, যেখানে তিনটি খাঁজকাটা খিলানবিশিষ্ট অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব স্থাপন করা হয়েছে, যার অলঙ্করণ আজও স্পষ্ট। মসজিদের চারকোণে রয়েছে আটকোনা বুরুজ, যা ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এছাড়াও নামাজ কক্ষ ও বারান্দার সংযোগস্থলে দুটি বুরুজ দেখা যায়। প্রতিটি বুরুজের নকশা সুলতানি আমলের স্থাপত্যকৌশলের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে।

মসজিদের ভেতর ও বাইরে একসময় টেরাকোটার চমৎকার অলঙ্করণ ছিল, যার কিছু কিছু নিদর্শন আজও দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান। ছাঁচকৃত কার্নিশ, খিলানবদ্ধ ক্ষুদ্র প্যানেল এবং সামনের দিকে প্রলম্বিত জানালাসদৃশ প্যানেলসমূহ এর অলঙ্করণশৈলীতে এক বিশেষ বৈচিত্র্য এনেছে, যা স্থাপত্য বিশ্লেষকদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মোজতবা খামেনির প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর পূর্ণ আনুগত্য

৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী খনিয়াদিঘি মসজিদ: ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অনবদ্য নিদর্শন

আপডেট সময় : ১০:৩২:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামের প্রাচীন জান্নাতবাদ নগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত খনিয়াদিঘি মসজিদ বাংলাদেশের এক অমূল্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো এই মসজিদটি শুধু ইতিহাসপ্রেমীদের কাছেই নয়, বরং প্রকৃতি ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এক বিশেষ আকর্ষণ। স্থানীয়ভাবে এটি রাজবিবি মসজিদ, খঞ্জনদিঘি মসজিদ বা চামচিকা মসজিদ নামেও পরিচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থানটিতে বাস, মাইক্রোবাস, সিএনজি বা অটোরিকশার মতো সহজলভ্য যানবাহনে যাতায়াত করা যায়।

মসজিদের নির্মাণকাল সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট শিলালিপি না থাকলেও, এর স্থাপত্যশৈলী ও অলঙ্করণ রীতির ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হয় যে এটি ইলিয়াস শাহী বংশের দ্বিতীয় পর্বে, আনুমানিক ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে নির্মিত হয়েছিল। পুরো ইমারতটি ইট ও পাথরের সমন্বয়ে নির্মিত, যা এর দীর্ঘস্থায়ীত্বের পরিচায়ক। মসজিদের কেন্দ্রে রয়েছে ৯ মিটার পার্শ্ববিশিষ্ট একটি বর্গাকার নামাজ কক্ষ, যার পূর্বদিকে রয়েছে ৯ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি বারান্দা। নামাজ কক্ষের উপরে অবস্থিত বিশাল গোলাকার গম্বুজটি এর স্থাপত্যিক সৌন্দর্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বারান্দার উপরে শোভা পাচ্ছে আরও তিনটি ছোট আকারের গম্বুজ, যা বাংলার গম্বুজ স্থাপত্যের এক সমৃদ্ধ উদাহরণ।

নামাজ কক্ষের অভ্যন্তরে তিনটি মিহরাব রয়েছে, যার মধ্যে মধ্যবর্তী মিহরাবটি তুলনামূলকভাবে বড় এবং সামনের দিকে প্রসারিত, যা এর গুরুত্ব নির্দেশ করে। পাশের দুটি মিহরাব অপেক্ষাকৃত ছোট ও সরল নকশার। কেবলা দেয়ালের ভেতরের অংশ গ্রানাইট পাথরের খণ্ডে আচ্ছাদিত, যেখানে তিনটি খাঁজকাটা খিলানবিশিষ্ট অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব স্থাপন করা হয়েছে, যার অলঙ্করণ আজও স্পষ্ট। মসজিদের চারকোণে রয়েছে আটকোনা বুরুজ, যা ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এছাড়াও নামাজ কক্ষ ও বারান্দার সংযোগস্থলে দুটি বুরুজ দেখা যায়। প্রতিটি বুরুজের নকশা সুলতানি আমলের স্থাপত্যকৌশলের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে।

মসজিদের ভেতর ও বাইরে একসময় টেরাকোটার চমৎকার অলঙ্করণ ছিল, যার কিছু কিছু নিদর্শন আজও দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান। ছাঁচকৃত কার্নিশ, খিলানবদ্ধ ক্ষুদ্র প্যানেল এবং সামনের দিকে প্রলম্বিত জানালাসদৃশ প্যানেলসমূহ এর অলঙ্করণশৈলীতে এক বিশেষ বৈচিত্র্য এনেছে, যা স্থাপত্য বিশ্লেষকদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।