ঢাকা ১২:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬

রেমিট্যান্স প্রবাহে সংকটের শঙ্কা: মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে অস্থির শ্রমবাজার

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি— রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর নতুন করে কালো মেঘ তৈরি করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় শ্রমবাজার, বিমান যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই সংঘাতের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ৭ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা প্রবাসীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে অনিশ্চয়তা: বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যেখানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অঞ্চল থেকেই এসেছিল রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিক ছাঁটাই, কাজের সুযোগ কমে যাওয়া এবং কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী রবিবার (৮ মার্চ) সিলেটে এক সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে স্বাভাবিকভাবেই রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”

অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠক: পরিস্থিতি মোকাবিলায় শনিবার (৭ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে দেশের শীর্ষ ৮ অর্থনীতিবিদ বৈঠক করেন। তাঁরা সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে শ্রমিকদের চলাচল বিঘ্নিত হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রিজার্ভে। তাঁরা হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর হওয়া এবং নতুন বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধানের পরামর্শ দিয়েছেন।

শ্রমিক যাতায়াতে বড় ধাক্কা: আকাশপথে যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় নতুন কর্মী পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে:

  • গত ৯ দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে অন্তত ৩০০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
  • শুধু রবিবার (৮ মার্চ) একদিনেই বাতিল হয়েছে ২৬টি ফ্লাইট।
  • দাম্মাম, দোহা, দুবাই ও কুয়েতগামী এসব ফ্লাইট বাতিলের ফলে অন্তত ৫৫ হাজার যাত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
  • বহু প্রবাসী কর্মী ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না, ফলে তাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ: অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, “যুদ্ধ দীর্ঘ হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়বে, যার ফলে প্রবাসীদের সঞ্চয় কমে যাবে।” ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের শরিফুল হাসান জানান, অনেক শ্রমিক ৩-৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানি বাংলাদেশের আয়ের প্রধান উৎস হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু প্রবাসীদের জীবনকেই নয়, দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতি ও রিজার্ভকেও চাপের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মোজতবা খামেনির প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর পূর্ণ আনুগত্য

রেমিট্যান্স প্রবাহে সংকটের শঙ্কা: মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে অস্থির শ্রমবাজার

আপডেট সময় : ০৯:৪৮:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি— রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর নতুন করে কালো মেঘ তৈরি করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় শ্রমবাজার, বিমান যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই সংঘাতের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ৭ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা প্রবাসীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে অনিশ্চয়তা: বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যেখানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অঞ্চল থেকেই এসেছিল রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিক ছাঁটাই, কাজের সুযোগ কমে যাওয়া এবং কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী রবিবার (৮ মার্চ) সিলেটে এক সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে স্বাভাবিকভাবেই রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”

অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠক: পরিস্থিতি মোকাবিলায় শনিবার (৭ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে দেশের শীর্ষ ৮ অর্থনীতিবিদ বৈঠক করেন। তাঁরা সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে শ্রমিকদের চলাচল বিঘ্নিত হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রিজার্ভে। তাঁরা হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর হওয়া এবং নতুন বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধানের পরামর্শ দিয়েছেন।

শ্রমিক যাতায়াতে বড় ধাক্কা: আকাশপথে যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় নতুন কর্মী পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে:

  • গত ৯ দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে অন্তত ৩০০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
  • শুধু রবিবার (৮ মার্চ) একদিনেই বাতিল হয়েছে ২৬টি ফ্লাইট।
  • দাম্মাম, দোহা, দুবাই ও কুয়েতগামী এসব ফ্লাইট বাতিলের ফলে অন্তত ৫৫ হাজার যাত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
  • বহু প্রবাসী কর্মী ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না, ফলে তাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ: অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, “যুদ্ধ দীর্ঘ হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়বে, যার ফলে প্রবাসীদের সঞ্চয় কমে যাবে।” ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের শরিফুল হাসান জানান, অনেক শ্রমিক ৩-৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানি বাংলাদেশের আয়ের প্রধান উৎস হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু প্রবাসীদের জীবনকেই নয়, দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতি ও রিজার্ভকেও চাপের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।