পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের দামামা বাজলেই বিশ্বজুড়ে যে কাঁপুনি ধরে, তার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ৩৬ থেকে ৩৯ কিলোমিটার চওড়া এক সরু জলপথ— হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ তেল এবং এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। সম্প্রতি ইরানি নেতৃত্বের ওপর হামলা এবং পাল্টাপাল্টি আক্রমণের ফলে এই ‘লাইফলাইন’ এখন হুমকির মুখে। এই ভূ-রাজনৈতিক দাবানল বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে।
বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও তেলের মূল্যের পূর্বাভাস
সংঘাতের জেরে সৌদি আরব তাদের বিশাল শোধনাগার ‘রাস তানুরা’ বন্ধ করে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইঙ্গিত অনুযায়ী যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হলে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ থেকে ১৬০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। জ্বালানির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি আঘাত করবে পরিবহন ও খাদ্যপণ্যের দামে, যা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলবে।
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সক্ষমতা
দেশের জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা অভ্যন্তরীণ বাজারে পৌঁছাতে বড়জোর তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। বর্তমানে মজুদের চিত্র নিম্নরূপ:
| জ্বালানির ধরন | মজুদের পরিমাণ (দিন) |
| ডিজেল | ১৪ দিন |
| অকটেন | ৩১ দিন |
| পেট্রোল | ১৭ দিন |
| ফার্নেস অয়েল | ৯৩ দিন |
| জেট ফুয়েল | ৫৫ দিন |
গ্যাস ও বিদ্যুতের ঝুঁকি:
দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩৫ শতাংশই (৯৫ কোটি ঘনফুট) আমদানিকৃত এলএনজি। গ্রীষ্মের আসন্ন ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এই গ্যাস ও কয়লা অপরিহার্য। কিন্তু কয়লা আমদানিতে দীর্ঘসূত্রিতা এবং এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বোরো মৌসুমে সেচ ও বাসাবাড়িতে তীব্র লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
উত্তরণের পথ ও কৌশলগত সুপারিশ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে এখনই কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে:
- বিকল্প উৎস সন্ধান: শুধু হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভর না করে ওমান, ব্রুনাই বা ভারতের পাইপলাইনের মাধ্যমে রুশ তেল আমদানির ওপর জোর দেওয়া।
- কৌশলগত তৈলাধার (Strategic Storage): বর্তমানে দেশে কেবল ‘চলতি আধার’ আছে। অধ্যাপক ড. ম. তামিমের মতে, অন্তত ৪ লাখ টন ডিজেল মজুদের সক্ষমতাসম্পন্ন ‘কৌশলগত তৈলাধার’ নির্মাণ করা জরুরি, যা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সামাল দিতে বাফার হিসেবে কাজ করবে।
- রেশনিং ও সাশ্রয়: ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ, শপিং মলে আলোকসজ্জা বন্ধ এবং অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা।
- কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে জোর: গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দ্রুত ইন্দোনেশিয়া বা অস্ট্রেলিয়া থেকে কয়লা আমদানির চুক্তি সম্পন্ন করে অলস বসে থাকা কেন্দ্রগুলো সচল করা।
উপসংহার:
বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য এই জ্বালানি সংকট একটি এসিড টেস্ট। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় না আসায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমাদের নির্ভরতা প্রবল। মধ্যপ্রাচ্য শান্ত না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি খাতে ‘দুঃসংবাদই এখনকার একমাত্র সংবাদ’।
রিপোর্টারের নাম 
























