ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধের এক সপ্তাহ পার হয়েছে আর এরমধ্যে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অশান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামরিক সাফল্যকে পরিষ্কার ভূ-রাজনৈতিক জয়ে রূপান্তর করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে বাড়তে থাকা ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়া এবং স্থল, জল ও আকাশপথে ইরানি বাহিনীর ওপর বিধ্বংসী আঘাত সত্ত্বেও এই সংকট দ্রুত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। এটি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও দীর্ঘায়িত এক সামরিক সংঘাতে লিপ্ত থাকার হুমকির মুখে ফেলেছে।
কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে ধোঁয়াশা
ওয়াশিংটনের জনস হপকিন্স স্কুল ফর অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, ‘ইরান একটি আগোছালো এবং দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান হতে পারে। ট্রাম্প বিশ্ব অর্থনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার নিজের রিপাবলিকান পার্টির কার্যকারিতকে ঝুঁকিতে ফেলছেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান (অপারেশন এপিক ফিউরি) । তবে ট্রাম্প এখনও এই যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য বা শেষ কোথায়, তা স্পষ্টভাবে র্নিধারণ করতে পারছেন না। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য জানিয়েছেন, ট্রাম্পের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস করা, নৌবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করা এবং তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন রোধ করা।
এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের সমর্থকরা এই যুদ্ধের পক্ষে থাকলেও, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধের বিরোধিতা বাড়ছে। রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, ‘আমেরিকানরা ইরাক বা আফগানিস্তানের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি চায় না।’
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ নিয়ে ট্রাম্পের মিশ্র বার্তা। যুদ্ধের শুরুতে তিনি ইরান সরকারকে উৎখাতের ইঙ্গিত দিলেও পরে তা নিয়ে আর কিছু বলেননি। আবার বৃহস্পতিবার তিনি বলেন যে ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে তিনি ভূমিকা রাখবেন এবং শুক্রবার ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন।
ভেনিজুয়েলা মডেলের ভুল হিসাব?
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্প ধারণা করেছিলেন ইরান অভিযানটিও এ বছরের শুরুর দিকে ভেনিজুয়েলা অভিযানের মতো সহজ হবে। ভেনিজুয়েলায় বিশেষ বাহিনী প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে বন্দি করার পর দ্রুত দেশটির তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ইরান অনেক বেশি সুসজ্জিত এবং শক্তিশী শত্রু হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। খামেনিকে হত্যার পরও ইরান সামরিকভাবে পাল্টা জবাব দেওয়া বন্ধ করেনি।
তেল ও অর্থনৈতিক ধাক্কা
বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ‘হরমুজ প্রণালী’, বিশ্বজুড়ে সরবরাহকৃত তেলের এক পঞ্চমাংশ এ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানি হুমকির মুখে সেখানে তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আমেরিকার বাজারে তেলের দাম বাড়লে তা ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে, যারা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে এমনিতেই চিন্তিত।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জোশ লিপস্কি বলেন, ‘এই অর্থনৈতিক আঘাতের বিষয়টি সম্ভবত পুরোপুরি আঁচ করা যায়নি।’
আঞ্চলিক ক্ষোভ ও মিত্রদের সংশয়
উপসাগরীয় আরব দেশগুলো যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কা সামলালেও সবাই ট্রাম্পের এই যুদ্ধে খুশি নয়। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিলিয়নিয়ার খালাফ আল হাবতুর এক খোলা চিঠিতে প্রশ্ন করেছেন, ‘আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?’
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল বেন হজেস রয়টার্সকে বলেন, ‘সামরিক কৌশল হিসেবে এটি চমৎকার হলেও রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং কূটনৈতিক দিক থেকে এই যুদ্ধের পরবর্তী পরিণতি নিয়ে খুব একটা ভাবা হয়েছে বলে মনে হয় না।’
রিপোর্টারের নাম 























