ঢাকা ০৬:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে বাংলাদেশি জাহাজ: ৩১ নাবিকের ঘরে ফেরার আকুতি

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রণাঙ্গনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে গত সাত দিন ধরে বিভীষিকাময় প্রহর গুনছেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’-র ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের সরাসরি আঁচ এসে পড়েছে এই বন্দরে, যেখানে মাথার ওপর ড্রোনের গুঞ্জন আর চারদিকে ক্ষেপণাস্ত্রের কানফাঁটা বিস্ফোরণে প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটি মৃত্যুকূপ। ঘরে ফেরার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন এই নাবিকরা।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাতে একটি ভিডিও বার্তায় জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, জেবেল আলী বন্দরের ১০ নম্বর টার্মিনালে নোঙর করা অবস্থায় প্রতিদিনই তাদের চোখের সামনে সামরিক তৎপরতা ঘটছে। জাহাজ থেকে প্রায় প্রতিদিনই আকাশে মিসাইল ও ড্রোন উড়তে দেখা যায় এবং মাঝে মাঝে আকাশে বিকট বিস্ফোরণও ঘটে। বন্দরের কাছাকাছি এলাকা থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ নাবিকদের উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ডেকের ওপর থেকে তাকালেই আকাশে মিসাইলের তীব্র আলো দেখতে পান তারা।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে জাহাজটি কাতার থেকে দুবাই পৌঁছায়। পণ্য খালাস শুরুর আগেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার সরাসরি শিকার হন নাবিকরা।

ক্যাপ্টেন শফিকুল জাহাজের ভেতরকার গুমোট আতঙ্কের কথা জানিয়ে বলেন, গত শনিবার তাদের জাহাজ থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে একটি তেল সংরক্ষণাগারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। সেই ভয়ংকর বিস্ফোরণের শব্দ আর আগুনের শিখা নাবিকদের আত্মাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ নাবিক জীবনে এমন জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে এর আগে কখনো পড়েননি ক্যাপ্টেন শফিকুল। চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ৩১টি পরিবারের প্রতিটি সদস্য এখন ফোনের ওপারে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলে তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও নিজের ভেতরকার উদ্বেগ চাপা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান। বর্তমানে জাহাজটিতে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি থাকলেও, নিরাপত্তার অভাব সব স্বস্তিকে কেড়ে নিয়েছে।

জেবেল আলী বন্দরে আরও প্রায় একশ জাহাজ অবস্থান করলেও, পরিস্থিতির চরম অস্থিরতা ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকদের মধ্যে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পণ্য খালাস শেষ হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। কিন্তু খালাস শেষ হলেই কি মুক্তি মিলবে? জাহাজটি ভাড়া নেওয়া বিদেশি কোম্পানি এখনো পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণ করেনি। ফলে ৩১ জন নাবিকের ভাগ্য এখন যুদ্ধের তীব্রতা এবং বিদেশি কোম্পানির সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলে আছে।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, সরকার ও দূতাবাসের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রংপুর বিভাগে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট: পাম্পগুলোতে পেট্রোলের দেখা নেই, গ্রাহকদের ভোগান্তি

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে বাংলাদেশি জাহাজ: ৩১ নাবিকের ঘরে ফেরার আকুতি

আপডেট সময় : ০৪:৩৩:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রণাঙ্গনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে গত সাত দিন ধরে বিভীষিকাময় প্রহর গুনছেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’-র ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের সরাসরি আঁচ এসে পড়েছে এই বন্দরে, যেখানে মাথার ওপর ড্রোনের গুঞ্জন আর চারদিকে ক্ষেপণাস্ত্রের কানফাঁটা বিস্ফোরণে প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটি মৃত্যুকূপ। ঘরে ফেরার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন এই নাবিকরা।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাতে একটি ভিডিও বার্তায় জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, জেবেল আলী বন্দরের ১০ নম্বর টার্মিনালে নোঙর করা অবস্থায় প্রতিদিনই তাদের চোখের সামনে সামরিক তৎপরতা ঘটছে। জাহাজ থেকে প্রায় প্রতিদিনই আকাশে মিসাইল ও ড্রোন উড়তে দেখা যায় এবং মাঝে মাঝে আকাশে বিকট বিস্ফোরণও ঘটে। বন্দরের কাছাকাছি এলাকা থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ নাবিকদের উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ডেকের ওপর থেকে তাকালেই আকাশে মিসাইলের তীব্র আলো দেখতে পান তারা।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে জাহাজটি কাতার থেকে দুবাই পৌঁছায়। পণ্য খালাস শুরুর আগেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার সরাসরি শিকার হন নাবিকরা।

ক্যাপ্টেন শফিকুল জাহাজের ভেতরকার গুমোট আতঙ্কের কথা জানিয়ে বলেন, গত শনিবার তাদের জাহাজ থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে একটি তেল সংরক্ষণাগারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। সেই ভয়ংকর বিস্ফোরণের শব্দ আর আগুনের শিখা নাবিকদের আত্মাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ নাবিক জীবনে এমন জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে এর আগে কখনো পড়েননি ক্যাপ্টেন শফিকুল। চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ৩১টি পরিবারের প্রতিটি সদস্য এখন ফোনের ওপারে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলে তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও নিজের ভেতরকার উদ্বেগ চাপা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান। বর্তমানে জাহাজটিতে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি থাকলেও, নিরাপত্তার অভাব সব স্বস্তিকে কেড়ে নিয়েছে।

জেবেল আলী বন্দরে আরও প্রায় একশ জাহাজ অবস্থান করলেও, পরিস্থিতির চরম অস্থিরতা ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকদের মধ্যে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পণ্য খালাস শেষ হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। কিন্তু খালাস শেষ হলেই কি মুক্তি মিলবে? জাহাজটি ভাড়া নেওয়া বিদেশি কোম্পানি এখনো পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণ করেনি। ফলে ৩১ জন নাবিকের ভাগ্য এখন যুদ্ধের তীব্রতা এবং বিদেশি কোম্পানির সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলে আছে।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, সরকার ও দূতাবাসের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।