দুই দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী সেক্রেটারি পল কাপুর। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাতে তিনি দিল্লী থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান। ঢাকায় আসার পর আজ বুধবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে যান পল কাপুর। তিনি প্রথমে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য, অবৈধ অভিবাসন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রশংসা
পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পল কাপুর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রশংসা করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নির্বাচন এত শান্তিপূর্ণ ও অবাধ হয়েছে যে, তা তাদের প্রত্যাশারও বাইরে ছিল।
খলিলুর রহমান বলেন, “পল কাপুর আমাকে বলেছেন- আমার মনে আছে, আপনি ওয়াশিংটন সফরে বলেছিলেন যে আপনারা এই নির্বাচন উৎসবমুখর করতে চান। তখন আমরা ভেবেছিলাম আদৌ কি তাই হবে? পরে আমরা দেখলাম, আসলেই একটি উৎসবমুখর নির্বাচন হয়েছে।”
সহকারী সচিব কাপুর বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও উৎসবমুখর সাধারণ নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণে অভিনন্দন জানান। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো অভিনন্দন পত্রের কথাও উল্লেখ করেন এবং আগামীদিনে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আস্থা প্রকাশ করেন।
‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির সঙ্গে পরিচিতি, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে অঙ্গীকার
পল কাপুরের সঙ্গে সাক্ষাতে জানানো হয়েছে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতিতে এই সরকার চলবে। খলিলুর রহমান বলেন, “আমাদের স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে বজায় রেখে অন্যান্য সব দেশের সঙ্গে আমাদের পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ড নির্বাহ করব, এটা আমরা তাকে বলেছি। কাপুর আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী দিনগুলোতে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় ও বিস্তৃত হবে।”
খলিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জাতীয় স্বার্থ ও অভিন্ন সমৃদ্ধি উন্নয়নে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরেন।
অবৈধ অভিবাসন নিয়ে আলোচনায় জোর
পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং মার্কিন অ্যাসিসটেন্ট সেক্রেটারি পল কাপুর যুক্তরাষ্ট্রে কাগজপত্রহীন অবৈধ বাংলাদেশিদের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তাদের বৈঠকে এই বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যে কয়েক হাজার অবৈধ বাংলাদেশির তালিকা করেছে। তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়।
খলিলুর রহমান বলেন, “আমরা বৈধ কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশি, যারা যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, তাদের ফিরিরে আনার ব্যাপারেও কথা বলেছি। প্রসেসটা যাতে সহজ হয় এবং সম্মানের সঙ্গে তারা আসতে পারেন, সেই নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মার্কিন রাষ্ট্রদূত এই বিষয়ে আগে কথা বলেছেন বলে আমাকে জানিয়েছেন।”
বাণিজ্য চুক্তি ও মার্কিন বিনিয়োগ নিয়ে আলাপ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্বাচনের দুই দিন আগে বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই চুক্তি কার্যকর করার বিষয়ে আলাপ হয়েছে পল কাপুর এবং খলিলুর রহমানের মধ্যে। পল কাপুর বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ জোরদারে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির বিধান বাস্তবায়নের গুরুত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নীতি ধারাবাহিকতায় সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে আলোচনা করেছেন পল কাপুর। বৈঠক শেষে বানিজ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি প্রায় পৌনে তিন বিলিয়ন ডলার। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশে যে সমালোচনা হচ্ছে, সে বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, “যেকোনও চুক্তিতেই দুই পক্ষের স্বার্থ জড়িত থাকে। কিছু ধারা এক পক্ষের অনুকূলে থাকে, আবার কিছু ধারা অন্য পক্ষের জন্য সুবিধাজনক হয়। আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের জন্য ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।”
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, “চুক্তিটিকে এখনই সম্পূর্ণ ইতিবাচক বা সম্পূর্ণ নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি রাষ্ট্রীয় চুক্তি এবং বাস্তবতা। তবে কোনও চুক্তিই চূড়ান্ত নয়—প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে এতে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।”
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বন্ধে বাংলাদেশের আহ্বান
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা তাদের মধ্যে আদান-প্রদানের সময় উঠে আসে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সব পক্ষের সংযম প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং প্রাণহানি কমাতে এবং এই অঞ্চল ও এর বাইরে আরও অস্থিতিশীলতা রোধে সংলাপ ও কূটনৈতিক উপায়ে সংঘাতের দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, “আমি পল কাপুরকে জানিয়েছি, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতে আমাদের দুজন বাংলাদেশি মারা গেছেন, সাতজন আহত হয়েছেন। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত বা বিস্তৃত হয়, তবে বাংলাদেশের মতো দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। আমরা চাই, যত দ্রুত সম্ভব কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধান করা হোক।”
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কামনা
রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানান এবং এই সংকটের টেকসই সমাধানে টেকসই আন্তর্জাতিক সমর্থন কামনা করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “রোহিঙ্গা বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। ওনারা আমাদের সঙ্গে একমত, এ বিষয়ে এখন সমাধানের দিকে আগাতে হবে এবং আমি আনন্দিত তারা এ বিষয়ে আমাদেরকে সব ধরনের সহযোগিতা দেবেন।”
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জ্বালানি সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা থাকায় সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জ্বালানি সহায়তা চেয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কায় বাংলাদেশ। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা শুধু বাংলাদেশ নয়; পুরো বিশ্বের। যাতে কোনও ডিজাস্টার নয় সে ব্যাপারে সরকার সচেষ্ট আছে।”
সরকার এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জ্বালানি সহায়তা চেয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “মার্কিন প্রশাসনের আরও ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলে পল কাপুর বিষয়টি জানাবেন। তবে জ্বালানি সাশ্রয় করে চললে ঈদের ছুটি পর্যন্ত বা মার্চ মাস পর্যন্ত মজুত জ্বালানি দিয়ে চলা যাবে।”
সফরের শেষদিন করবেন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক
পল কাপুর তার দুইদিনের সফরের শেষদিন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং দুপুরে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। বিকালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এদিন তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন বলেও জানা গেছে। এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ইফতার মাহফিলেও যোগ দেওয়ার কথা আছে তার।
রিপোর্টারের নাম 




















