ঢাকা ১১:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে সংসদে

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের ৫৫৯ দিনের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ হবে আগামী সংসদ অধিবেশনে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন বসার প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে যদি জাতীয় সংসদ এই অধ্যাদেশেরগুলোর আইনি ভিত্তি না দেয়, তবে সেগুলো বাতিল হয়ে যাবে। এর অধীনে হওয়া সব কর্মকাণ্ডও বৈধতা হারাবে। তবে জারি করা সব অধ্যাদেশের প্রথম দিনেই উপস্থাপন করতে সরকার বাধ্য নয়।

সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ অধিবেশন না থাকলে বা সংসদ ভেঙে গেলে রাষ্ট্রপতি ‘আশু ব্যবস্থা’ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি থাকলে অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। এর অর্থ, ড. ইউনূস সরকারের আমলে ১৩৩ বার রাষ্ট্রপতি এই ‘আশু ব্যবস্থা’ প্রয়োজনীয় মনে করেছিলেন। তখন রাষ্ট্রপতির সেই ক্ষমতা ও পরিস্থিতি উপলব্ধির মানসিকতা যথাযথ ছিল কিনা, তা এখন আলোচনার বিষয়।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উপ-অনুচ্ছেদ (২)। এর নির্দেশনা অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরু হলে প্রথম দিনই এই সব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। যদি ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সব অর্ডিন্যান্স উপস্থাপন না হয়, সংসদের তিনটি পথ খোলা থাকবে:

প্রথম দিনই সব অর্ডিন্যান্স বাতিল করা। ক্রমান্বয়ে বাতিল করা, যেমন প্রথম দিনে ৫টি, পরবর্তী দিনে আরও ১০টি। পরবর্তী সপ্তাহে আরও ২০টি, এভাবে সব অধ্যাদেশ বাতিল।

যদি অধ্যাদেশগুলো বাতিল না হয় বা কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তাহলে প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মাথায় সব অর্ডিন্যান্সের কার্যকারিতা লোপ পাবে। অর্থাৎ সংসদের প্রথম ৩০ দিনে অনুমোদন না হলে সব অর্ডিন্যান্স অকার্যকর হয়ে যাবে।

আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দেড় মাসে ৪৫ দিনে ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। ২০২৫ সালে ৮০টি, আর ২০২৪ সালের শেষ দিকে ১৭টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। গড়পড়তা সময় লেগেছে ৯ দিন।

এক্ষেত্রে পুরোনো অভিজ্ঞতাও আছে। এক-এগারো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭-২০০৯ পর্যন্ত ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। নবম সংসদে ১২২টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হয়। সংসদীয় কমিটি ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করেছিল, বাকিগুলো বাতিল হয়। এছাড়া হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতির আমলে জারি ৫৯৫টি অধ্যাদেশ ২০১০ সালে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

ড. ইউনূস সরকারের ১৩৩ অর্ডিন্যান্সের মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো: গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫; জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬; ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪; সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫; মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫; বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে আহসান এইচ মনসুরের বয়স বাড়িয়ে নিয়োগের বিশেষ অধ্যাদেশ।

বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসামুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনে সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশই উপস্থাপন করতে চায়। এজন্য অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আপাতত এ বিষয়ে এর বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না।

ট্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদে অনুমোদন না হলে অধ্যাদেশগুলোর আইনগত বৈধতা থাকবে না। আইনগত বৈধতার স্বার্থে ৩০ দিনের মধ্যে এগুলো সংসদে উত্থাপন ও অনুমোদন করা প্রয়োজন। তবে সব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করতে সরকারের কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের আওতায় জারিকৃত অধ্যাদেশ আইনের সমমর্যাদা রাখলেও, সংসদ অধিবেশন বসার পর ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না হলে এর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) পলিটব্যুরো সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে সব অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করতে হলে বর্তমান সরকারকে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চারটি অধ্যাদেশ অনুমোদন করতে হবে। অতিরিক্তভাবে, অন্তরবর্তী সরকারের সময় তড়িঘড়ি করে অনেক অধ্যাদেশ জারি হয়েছে এবং দু-একজন উপদেষ্টার বিশেষ তৎপরতায় কিছু অধ্যাদেশের জারির তথ্য প্রচারিত হয়েছে।

তবে অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করা সময়সাপেক্ষ, তাই ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পেলে সব অর্ডিন্যান্সের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করলেন সদ্যবিদায়ী গভর্নরের উপদেষ্টা

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে সংসদে

আপডেট সময় : ১০:১৭:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের ৫৫৯ দিনের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ হবে আগামী সংসদ অধিবেশনে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন বসার প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে যদি জাতীয় সংসদ এই অধ্যাদেশেরগুলোর আইনি ভিত্তি না দেয়, তবে সেগুলো বাতিল হয়ে যাবে। এর অধীনে হওয়া সব কর্মকাণ্ডও বৈধতা হারাবে। তবে জারি করা সব অধ্যাদেশের প্রথম দিনেই উপস্থাপন করতে সরকার বাধ্য নয়।

সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ অধিবেশন না থাকলে বা সংসদ ভেঙে গেলে রাষ্ট্রপতি ‘আশু ব্যবস্থা’ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি থাকলে অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। এর অর্থ, ড. ইউনূস সরকারের আমলে ১৩৩ বার রাষ্ট্রপতি এই ‘আশু ব্যবস্থা’ প্রয়োজনীয় মনে করেছিলেন। তখন রাষ্ট্রপতির সেই ক্ষমতা ও পরিস্থিতি উপলব্ধির মানসিকতা যথাযথ ছিল কিনা, তা এখন আলোচনার বিষয়।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উপ-অনুচ্ছেদ (২)। এর নির্দেশনা অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরু হলে প্রথম দিনই এই সব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। যদি ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সব অর্ডিন্যান্স উপস্থাপন না হয়, সংসদের তিনটি পথ খোলা থাকবে:

প্রথম দিনই সব অর্ডিন্যান্স বাতিল করা। ক্রমান্বয়ে বাতিল করা, যেমন প্রথম দিনে ৫টি, পরবর্তী দিনে আরও ১০টি। পরবর্তী সপ্তাহে আরও ২০টি, এভাবে সব অধ্যাদেশ বাতিল।

যদি অধ্যাদেশগুলো বাতিল না হয় বা কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তাহলে প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মাথায় সব অর্ডিন্যান্সের কার্যকারিতা লোপ পাবে। অর্থাৎ সংসদের প্রথম ৩০ দিনে অনুমোদন না হলে সব অর্ডিন্যান্স অকার্যকর হয়ে যাবে।

আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দেড় মাসে ৪৫ দিনে ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। ২০২৫ সালে ৮০টি, আর ২০২৪ সালের শেষ দিকে ১৭টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। গড়পড়তা সময় লেগেছে ৯ দিন।

এক্ষেত্রে পুরোনো অভিজ্ঞতাও আছে। এক-এগারো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭-২০০৯ পর্যন্ত ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। নবম সংসদে ১২২টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হয়। সংসদীয় কমিটি ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করেছিল, বাকিগুলো বাতিল হয়। এছাড়া হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতির আমলে জারি ৫৯৫টি অধ্যাদেশ ২০১০ সালে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

ড. ইউনূস সরকারের ১৩৩ অর্ডিন্যান্সের মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো: গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫; জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬; ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪; সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫; মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫; বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে আহসান এইচ মনসুরের বয়স বাড়িয়ে নিয়োগের বিশেষ অধ্যাদেশ।

বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসামুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনে সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশই উপস্থাপন করতে চায়। এজন্য অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আপাতত এ বিষয়ে এর বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না।

ট্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদে অনুমোদন না হলে অধ্যাদেশগুলোর আইনগত বৈধতা থাকবে না। আইনগত বৈধতার স্বার্থে ৩০ দিনের মধ্যে এগুলো সংসদে উত্থাপন ও অনুমোদন করা প্রয়োজন। তবে সব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করতে সরকারের কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের আওতায় জারিকৃত অধ্যাদেশ আইনের সমমর্যাদা রাখলেও, সংসদ অধিবেশন বসার পর ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না হলে এর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) পলিটব্যুরো সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে সব অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করতে হলে বর্তমান সরকারকে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চারটি অধ্যাদেশ অনুমোদন করতে হবে। অতিরিক্তভাবে, অন্তরবর্তী সরকারের সময় তড়িঘড়ি করে অনেক অধ্যাদেশ জারি হয়েছে এবং দু-একজন উপদেষ্টার বিশেষ তৎপরতায় কিছু অধ্যাদেশের জারির তথ্য প্রচারিত হয়েছে।

তবে অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করা সময়সাপেক্ষ, তাই ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পেলে সব অর্ডিন্যান্সের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।