ঢাকা ০৫:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অভিঘাত ও উত্তরণের কৌশল

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বিশ্ববাজারে রপ্তানি হয়, তার সিংহভাগই এই সরু প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করে। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই জলপথের একপাশে ওমান এবং অন্যপাশে ইরানের অবস্থান। সম্প্রতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান এই প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারি দেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে নৌপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩১ শতাংশ এবং সিএনজির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই সরবরাহ করা হয়।

ভূগোলগতভাবে বাংলাদেশ হরমুজ প্রণালির সরাসরি তীরবর্তী না হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে এর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর, যার প্রধান উৎস উপসাগরীয় দেশগুলো। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারীদের রপ্তানি পথ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ সময়ের জন্য এই প্রণালি অচল হয়ে পড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়া প্রায় অনিবার্য।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে প্রথম ধাক্কা আসবে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির দাম দ্রুতগতিতে বাড়বে, যা সরাসরি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং শিল্প উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করবে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয়কে বাড়িয়ে দেবে। সরকার যদি ভর্তুকি বাড়ায়, তবে বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে; আর যদি ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলবে।

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি শুধু বিদ্যুৎ বা পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর ঢেউ অর্থনীতির প্রায় সব খাতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, কৃষি খাতে সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে, যা টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং টাকার অবমূল্যায়ন ঘটাবে। এর ফলে আমদানিনির্ভর অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়বে, যা অর্থনীতিতে ‘দ্বৈত চাপ’ তৈরি করবে – একদিকে আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে বিনিময় হারজনিত চাপ।

উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া যদি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে এসব দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, যা শ্রমবাজার সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করবে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ অপরিহার্য। জ্বালানি সংকট উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে, যা রপ্তানি আদেশ পূরণে সমস্যা তৈরি করবে। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপ ও আমেরিকার ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ডেকে আনলে পোশাকের মতো পণ্যের চাহিদা কমে যাবে, ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হ্রাসের ঝুঁকিও তৈরি হবে।

এমন বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হবে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎস যেমন আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা লাতিন আমেরিকা থেকে তেল ও এলএনজি আমদানির চুক্তি বাড়ানো যেতে পারে, যদিও পরিবহন ব্যয় কিছুটা বেশি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো অপরিহার্য। সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ালে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে।

অনেক দেশ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ গড়ে তোলে, যাতে বৈশ্বিক সংকটের সময় কয়েক মাসের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। স্বল্প মেয়াদে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা গেলে আকস্মিক সরবরাহ ব্যাহত হলেও তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। শুধু সরবরাহ বাড়ানো নয়, চাহিদা ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যুৎ অপচয় কমাতে স্মার্ট গ্রিড ও আধুনিক বিতরণ ব্যবস্থা জরুরি। ব্যক্তিগত পর্যায়েও গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ এবং শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় পথ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি ও গ্যাস পাইপলাইন সংযোগ বাড়ানো গেলে বহুমাত্রিক সরবরাহ নিশ্চিত হবে। এছাড়া, বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে কোনো একক অঞ্চলের অস্থিরতা আমাদের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব না ফেলে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রবাসী আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলবে। একইসঙ্গে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী রাখতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে নিম্নআয়ের মানুষ বিপদে না পড়ে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি প্রবাহের এক গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। এটি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকেও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে গভীর সংকটে পড়তে পারে। তবে সংকটের এই আশঙ্কাই হতে পারে নীতি সংস্কারের এক বড় সুযোগ। জ্বালানি বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি – এসব পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা সহজ হবে। দূরদর্শী পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এই অনিশ্চিত বিশ্বেও বাংলাদেশের স্থিতিশীল অগ্রযাত্রা সম্ভব।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ: সিপিডি’র মতে, ঘুরে দাঁড়াতে গভীর সংস্কার প্রয়োজন

হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অভিঘাত ও উত্তরণের কৌশল

আপডেট সময় : ০৩:৩১:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বিশ্ববাজারে রপ্তানি হয়, তার সিংহভাগই এই সরু প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করে। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই জলপথের একপাশে ওমান এবং অন্যপাশে ইরানের অবস্থান। সম্প্রতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান এই প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারি দেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে নৌপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩১ শতাংশ এবং সিএনজির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই সরবরাহ করা হয়।

ভূগোলগতভাবে বাংলাদেশ হরমুজ প্রণালির সরাসরি তীরবর্তী না হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে এর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর, যার প্রধান উৎস উপসাগরীয় দেশগুলো। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারীদের রপ্তানি পথ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ সময়ের জন্য এই প্রণালি অচল হয়ে পড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়া প্রায় অনিবার্য।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে প্রথম ধাক্কা আসবে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির দাম দ্রুতগতিতে বাড়বে, যা সরাসরি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং শিল্প উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করবে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয়কে বাড়িয়ে দেবে। সরকার যদি ভর্তুকি বাড়ায়, তবে বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে; আর যদি ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলবে।

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি শুধু বিদ্যুৎ বা পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর ঢেউ অর্থনীতির প্রায় সব খাতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, কৃষি খাতে সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে, যা টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং টাকার অবমূল্যায়ন ঘটাবে। এর ফলে আমদানিনির্ভর অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়বে, যা অর্থনীতিতে ‘দ্বৈত চাপ’ তৈরি করবে – একদিকে আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে বিনিময় হারজনিত চাপ।

উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া যদি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে এসব দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, যা শ্রমবাজার সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করবে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ অপরিহার্য। জ্বালানি সংকট উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে, যা রপ্তানি আদেশ পূরণে সমস্যা তৈরি করবে। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপ ও আমেরিকার ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ডেকে আনলে পোশাকের মতো পণ্যের চাহিদা কমে যাবে, ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হ্রাসের ঝুঁকিও তৈরি হবে।

এমন বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হবে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎস যেমন আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা লাতিন আমেরিকা থেকে তেল ও এলএনজি আমদানির চুক্তি বাড়ানো যেতে পারে, যদিও পরিবহন ব্যয় কিছুটা বেশি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো অপরিহার্য। সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ালে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে।

অনেক দেশ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ গড়ে তোলে, যাতে বৈশ্বিক সংকটের সময় কয়েক মাসের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। স্বল্প মেয়াদে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা গেলে আকস্মিক সরবরাহ ব্যাহত হলেও তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। শুধু সরবরাহ বাড়ানো নয়, চাহিদা ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যুৎ অপচয় কমাতে স্মার্ট গ্রিড ও আধুনিক বিতরণ ব্যবস্থা জরুরি। ব্যক্তিগত পর্যায়েও গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ এবং শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় পথ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি ও গ্যাস পাইপলাইন সংযোগ বাড়ানো গেলে বহুমাত্রিক সরবরাহ নিশ্চিত হবে। এছাড়া, বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে কোনো একক অঞ্চলের অস্থিরতা আমাদের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব না ফেলে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রবাসী আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলবে। একইসঙ্গে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী রাখতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে নিম্নআয়ের মানুষ বিপদে না পড়ে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি প্রবাহের এক গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। এটি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকেও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে গভীর সংকটে পড়তে পারে। তবে সংকটের এই আশঙ্কাই হতে পারে নীতি সংস্কারের এক বড় সুযোগ। জ্বালানি বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি – এসব পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা সহজ হবে। দূরদর্শী পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এই অনিশ্চিত বিশ্বেও বাংলাদেশের স্থিতিশীল অগ্রযাত্রা সম্ভব।