ঢাকা ০৬:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

তিস্তার চরে তামাকের দিন শেষ, সূর্যমুখীর হলুদে কৃষকের নতুন স্বপ্ন

এক সময়ের তামাকের আগ্রাসন আর ধু ধু বালুচরের রুক্ষতা পেরিয়ে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চর now সেজেছে সূর্যমুখীর হলদে হাসিতে। বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী চাষে কৃষকেরা খুঁজে পেয়েছেন নতুন স্বপ্নের হাতছানি, যা বদলে দিচ্ছে তাদের জীবনযাত্রা।

নদীর বুকে জেগে ওঠা এই চরাঞ্চল, যা এতদিন ছিল পতিত ও অনুৎপাদনশীল, তা এখন পরিণত হয়েছে নয়নাভিরাম এক ‘হলুদ গালিচায়’। সারি সারি সূর্যমুখী ফুলে ভরে ওঠা এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। এই অপরূপ শোভা শুধু নয়ন জুড়েই না, বরং কৃষকদের মনেও জাগিয়েছে নতুন আশা ও উদ্দীপনা।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, তামাক চাষের তুলনায় সূর্যমুখী চাষ অনেক বেশি লাভজনক ও সহজ। তামাক চাষে যেমন প্রয়োজন অতিরিক্ত শ্রম, তেমনি রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি। এর বিপরীতে, সূর্যমুখী চাষে খরচ অনেক কম এবং লাভ বেশি। প্রতি বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষে যেখানে মাত্র ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে ফলন পাওয়া যায় ৬ থেকে ৭ মণ পর্যন্ত। কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, “তামাক চাষে হাড়ভাঙা খাটুনি আর নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি ছিল। সূর্যমুখীতে খরচ কম, লাভ বেশি—তাই আমরা আশাবাদী।”

তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কৃষকদের দূরে সরিয়ে আনতে এবং চরাঞ্চলের পতিত জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের চর উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে মহিষখোঁচা ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষের প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। উন্নতমানের বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, আর কৃষকেরা দিয়েছেন তাদের জমি ও শ্রম।

মহিষখোঁচা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার রায় জানান, “তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করতে লাভজনক বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখী চাষ শুরু করা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় ফলন অত্যন্ত সন্তোষজনক হয়েছে।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, বর্ষা শেষে তিস্তার বুকে জেগে ওঠা বিশাল অনাবাদি চরাঞ্চলকে উৎপাদনের আওতায় আনাই ছিল মূল লক্ষ্য। তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সূর্যমুখী চাষের মাধ্যমে তামাকনির্ভরতা কমিয়ে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের মতে, তামাকের পরিবর্তে সূর্যমুখী চাষ জনপ্রিয় হলে একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, তেমনি দেশের ভোজ্যতেলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে এবং চরাঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তিস্তার চরাঞ্চলে সূর্যমুখীর এই সাফল্য কেবল কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প নয়, এটি টেকসই কৃষি ও স্বাস্থ্যসম্মত ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কাতারে মোসাদের গোপন তৎপরতা: দোহা অস্বীকার করলো অবগত থাকার তথ্য

তিস্তার চরে তামাকের দিন শেষ, সূর্যমুখীর হলুদে কৃষকের নতুন স্বপ্ন

আপডেট সময় : ০৫:০৪:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

এক সময়ের তামাকের আগ্রাসন আর ধু ধু বালুচরের রুক্ষতা পেরিয়ে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চর now সেজেছে সূর্যমুখীর হলদে হাসিতে। বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী চাষে কৃষকেরা খুঁজে পেয়েছেন নতুন স্বপ্নের হাতছানি, যা বদলে দিচ্ছে তাদের জীবনযাত্রা।

নদীর বুকে জেগে ওঠা এই চরাঞ্চল, যা এতদিন ছিল পতিত ও অনুৎপাদনশীল, তা এখন পরিণত হয়েছে নয়নাভিরাম এক ‘হলুদ গালিচায়’। সারি সারি সূর্যমুখী ফুলে ভরে ওঠা এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। এই অপরূপ শোভা শুধু নয়ন জুড়েই না, বরং কৃষকদের মনেও জাগিয়েছে নতুন আশা ও উদ্দীপনা।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, তামাক চাষের তুলনায় সূর্যমুখী চাষ অনেক বেশি লাভজনক ও সহজ। তামাক চাষে যেমন প্রয়োজন অতিরিক্ত শ্রম, তেমনি রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি। এর বিপরীতে, সূর্যমুখী চাষে খরচ অনেক কম এবং লাভ বেশি। প্রতি বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষে যেখানে মাত্র ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে ফলন পাওয়া যায় ৬ থেকে ৭ মণ পর্যন্ত। কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, “তামাক চাষে হাড়ভাঙা খাটুনি আর নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি ছিল। সূর্যমুখীতে খরচ কম, লাভ বেশি—তাই আমরা আশাবাদী।”

তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কৃষকদের দূরে সরিয়ে আনতে এবং চরাঞ্চলের পতিত জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের চর উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে মহিষখোঁচা ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষের প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। উন্নতমানের বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, আর কৃষকেরা দিয়েছেন তাদের জমি ও শ্রম।

মহিষখোঁচা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার রায় জানান, “তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করতে লাভজনক বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখী চাষ শুরু করা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় ফলন অত্যন্ত সন্তোষজনক হয়েছে।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, বর্ষা শেষে তিস্তার বুকে জেগে ওঠা বিশাল অনাবাদি চরাঞ্চলকে উৎপাদনের আওতায় আনাই ছিল মূল লক্ষ্য। তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সূর্যমুখী চাষের মাধ্যমে তামাকনির্ভরতা কমিয়ে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের মতে, তামাকের পরিবর্তে সূর্যমুখী চাষ জনপ্রিয় হলে একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, তেমনি দেশের ভোজ্যতেলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে এবং চরাঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তিস্তার চরাঞ্চলে সূর্যমুখীর এই সাফল্য কেবল কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প নয়, এটি টেকসই কৃষি ও স্বাস্থ্যসম্মত ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।