## জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন: সংসদ বনাম আদালত, জুবায়েরের স্পষ্ট বার্তা
ঢাকা: বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে “জুলাই জাতীয় সনদ” বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। এই সনদ কার্যকর করার ক্ষেত্রে আদালতের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, এটি একটি রাজনৈতিক ও সংসদীয় বিষয় এবং এর সমাধান হওয়া উচিত জাতীয় সংসদের মাধ্যমেই। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, “জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়টি জাতির সামনে স্পষ্ট হওয়া উচিত।”
গতকাল সোমবার রাতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট জুবায়ের এই মন্তব্য করেন। এসময় তাঁর সঙ্গে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মো. মনির উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধে সংস্কারের প্রস্তাবগুলো প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। এটি এখন জাতীয় সংসদের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। আগামী ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে এবং সেখানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন। তিনি অভিযোগ করেন, যারা এই বিষয়টিকে আদালতের কাঁধে চাপিয়ে উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করছেন, তাদের এই পদক্ষেপ সঠিক নয়। “বিষয়টি যেহেতু জাতীয় সংসদের, তাই সংসদ সদস্যদেরই এটি পালন করতে দেওয়া উচিত,” বলে তিনি জোর দেন।
জুবায়ের অতীতে আদালতকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের চেষ্টার নজির তুলে ধরে বলেন, এতে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং জাতীয় বিপর্যয় নেমে এসেছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার ফলেই বিগত ১৬ বছর দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে তিনি জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়টি জাতির সামনে স্পষ্ট করার আহ্বান জানান। যেহেতু বিষয়টি গণভোটে পাস হয়েছে, তাই তিনি অবিলম্বে এটি কার্যকর দেখতে চান।
অন্যদিকে, অ্যাডভোকেট শিশির মো. মনির এই বিষয়ে দুটি রিট পিটিশনের শুনানির বিস্তারিত তুলে ধরেন। প্রথম রিট পিটিশনে “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫” এবং “সাংবিধানিক সংস্কার সভা গঠন” সহ সংসদ সদস্য হিসেবে সংবিধান সংস্কার সভার সপক্ষে কেন সাংবিধানিক ঘোষণা দেওয়া হবে না, এই মর্মে রুল চাওয়া হয়েছে। যত দিন পর্যন্ত রুল নিষ্পত্তি না হবে, তত দিন পর্যন্ত একটি নিষেধাজ্ঞা আদেশও চাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় রিট পিটিশনে গণভোট অধ্যাদেশের ধারা, প্রশ্ন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, এই মর্মে রিট দায়ের করা হয়েছে। এই রিটে আইন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে, যাতে এ সংক্রান্ত কোনো পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ না করা হয়।
তিনি বলেন, শুনানিতে তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। প্রথমত, গণভোটের প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, অথচ গণভোট ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং মানুষ মতামত দিয়েছে। এখন প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করার অর্থ হলো গণভোটের ফলাফলকেই চ্যালেঞ্জ করা। দ্বিতীয়ত, জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছে, যেখানে মাত্র কয়েকটি ভিন্নমত ছিল। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, যা রাষ্ট্রপতির আদেশ, সেটিকেও সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করা হচ্ছে।
শিশির মনির আরও বলেন, সংসদ বসতে আর মাত্র ১০ দিন বাকি আছে। এত তাড়াহুড়া করে রিট পিটিশন দায়ের করার উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন এবং সরকারের ইন্ধন লক্ষ্য করার কথা বলেন। তিনি মনে করেন, এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিষয়টিকে আদালতে ‘সাব জুডিস’ দেখিয়ে সংসদকে বাধাগ্রস্ত করা। তিনি বলেন, সংসদ যদি ১০ দিন অপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আদালতের হস্তক্ষেপের কোনো কারণ থাকে না। যেহেতু নভেম্বর মাসে আদেশ হয়েছে এবং এখন মার্চ মাস, এতদিন কেন চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজন হয়নি, সে প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেন।
তিনি “ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোয়েশ্চন” নীতি উল্লেখ করে বলেন, উচ্চমাত্রার রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয় আদালতের বিবেচনার বাইরে থাকে। বাংলাদেশের অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার, গণভোট বা জাতীয় নির্বাচন আদালতের নির্দেশে হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, তারা কেবল গণভোটের অংশটুকু চ্যালেঞ্জ করছেন, জাতীয় নির্বাচনকে নয়, যা একই দিনে একই ব্যালটে হয়েছে। এটি প্রমাণ করে রিট পিটিশনগুলো ক্যালকুলেটিভ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
শিশির মনির অতীতে আদালতকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের চেষ্টার ফলে বুমেরাং হওয়ার নজির স্মরণ করিয়ে দেন এবং বলেন, এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এর সমাধান হওয়া উচিত। তিনি বর্তমান বিচারকের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন, যেহেতু তিনি বর্তমান সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত। তিনি বলেন, যদি অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বা গণভোট কিছুই বৈধ না হয়, তবে ওই বিচারকের নিয়োগ কীভাবে বৈধ হবে?
তিনি বিপ্লবের চেতনাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে বিষয়টিকে সংসদের পরিবর্তে আদালতের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করার কথা বলেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, কেন শুধু গণভোট বাতিলের দাবি উঠছে, জাতীয় নির্বাচন কেন নয়? মাঝখানে আরও ১৩৫টি অধ্যাদেশ রয়েছে, সেগুলোর কী হবে? তিনি বলেন, যদি সবকিছু বাতিল করতে হয়, তবে সবই বাতিল করা উচিত। কিন্তু সুবিধাজনক বিষয়গুলো রেখে অসুবিধাজনক বিষয় বাদ দেওয়ার মানসিকতা গ্রহণযোগ্য নয়।
সবশেষে, তিনি বলেন, একটি বিপ্লব-পরবর্তী চার্টারকে অপ্রাসঙ্গিক করার উদ্যোগ রাজনৈতিক ও আইনি ভুল এবং বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রেখে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সঠিক নয়।
রিপোর্টারের নাম 
























