## ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে তোলপাড়: প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য
তেহরান: এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। ৮৬ বছর বয়সি এই প্রবীণ নেতা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর সরবরাহকৃত তথ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারান। শনিবার দিনের আলোয় চালানো এই হামলায় খামেনির পরিবারের সদস্যসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে তেহরান। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
নজিরবিহীন হামলা ও ব্যাপক হতাহত:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর দেশটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শনিবার সকালে তেহরানের একটি সরকারি কম্পাউন্ডে শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক চলাকালীন ইসরায়েলি জঙ্গিবিমান অন্তত ৩০টি বোমা নিক্ষেপ করে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ months ধরে খামেনির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর এই তথ্য ইসরায়েলকে সরবরাহ করে। এই হামলায় খামেনির মেয়ে, নাতি, পুত্রবধূ, জামাতা এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, যেমন – প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দুর রহিম মুসাভি, ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কর্পসের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর এবং ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব আলি শামখানি নিহত হয়েছেন। ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদও এই হামলায় নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রত্যাখ্যান ও প্রতিশোধের হুঙ্কার:
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান খামেনির হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এটিকে “মহা অপরাধ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে মুসলিমদের, বিশেষ করে শিয়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন এবং এর প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। খামেনির মৃত্যুতে ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে, একই সঙ্গে সাত দিনের সরকারি ছুটিরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ইরাকও তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত:
খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ইরান ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তারা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকনে চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এছাড়া, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে তিনটি মার্কিন ও ব্রিটিশ তেল ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। তবে, মার্কিন বিমানবাহী রণতরীতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে কি না, তা যাচাই করা যায়নি।
অন্যদিকে, ইসরায়েলও ইরানে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা কেবল হামলা শুরু করেছে এবং আরও কয়েক দিনের অভিযান বাকি রয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, সেনাবাহিনী ইরানি শাসনের স্থানগুলো লক্ষ্য করে তীব্র হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, শনিবারের হামলায় অন্তত ৪০ শীর্ষ ইরানি নেতা নিহত হয়েছেন।
বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই হত্যাকাণ্ডকে মানবিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন এবং ইরানের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। ন্যাটো জোটও ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় বাহিনী সমন্বয় করছে।
খামেনি: এক অবিচ্ছেদ্য নেতৃত্ব:
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত ইরানের ধর্মীয় প্রজাতন্ত্রে তিনি ছিলেন দেশটির মূল চালিকাশক্তি। তিনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং সরকারের প্রধান, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, অর্থনীতির নেতা, সমাজের নেতা এবং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও বিবেচিত হতেন। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, তিনি সারা বিশ্বের মুসলমানদের নেতা হিসেবেও গণ্য হতেন। তার মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে।
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা:
এই ঘটনার পর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পাল্টা হামলা না চালানোর জন্য সতর্ক করেছেন, তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি আত্মরক্ষার অধিকারের ব্যাপারে কোনো সীমা মানবেন না বলে জানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য এক নতুন এবং ভয়াবহ সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।
রিপোর্টারের নাম 


















