ঢাকা ০৮:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা: রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু

ইরানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সৃষ্ট এই পদটি ইরানের সর্বময় ক্ষমতার প্রতীক। বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনি রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাখেন, যা দেশের আইনসভা, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনকেও প্রভাবিত করে।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সফল পরিসমাপ্তির পর ইরানের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার পদটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই পদের প্রথম ধারক ছিলেন বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, যিনি ১৯৭৯ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইরানের সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু হলে বা পদত্যাগ করলে, নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিন সদস্যের একটি পরিষদ সাময়িকভাবে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয়।

ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সরকার মূলত আইনসভা, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসন—এই তিন ভাগে বিভক্ত। সংবিধানের ৫৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই প্রতিটি বিভাগই সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রের অভিভাবকত্বের অধীনে পরিচালিত হয়। যদিও ইরানের রাজনীতিতে বহুমুখী মতাদর্শের চর্চা রয়েছে, তবে জাতীয় নিরাপত্তা এবং ইসলামী বিপ্লবের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে সর্বোচ্চ নেতার পদটি শুরু থেকেই জনমত ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। সংবিধানে নেতার কাজের ওপর নজরদারি ও মতপ্রকাশের সুযোগ থাকলেও, সর্বোচ্চ নেতাকে প্রায়শই ইসলামী বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই তার বিরোধিতা করাকে বিপ্লবের বিরুদ্ধাচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।

ক্ষমতার পরিধি ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ
সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতার পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। সংবিধানের ৯১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তিনি গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ১২ জন সদস্যের মধ্যে ছয় জনকে মনোনীত করেন। এছাড়া ১৫৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে, দেশের প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর হাতে। রাষ্ট্রের সার্বিক নীতি নির্ধারণে তিনি এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং সমগ্র শাসনব্যবস্থা তদারকির ক্ষমতা রাখেন (১১০ অনুচ্ছেদ)। গণভোট ডাকার ক্ষমতাও সর্বোচ্চ নেতার এখতিয়ারভুক্ত।

ইরানের প্রেসিডেন্ট যদিও মন্ত্রীদের সহযোগিতায় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন (৬০ অনুচ্ছেদ), তবে সংবিধান যে ক্ষমতাগুলো সর্বোচ্চ নেতার জন্য সংরক্ষিত রেখেছে, সেগুলো বাদে। সর্বোচ্চ নেতা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর বিজয়ীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপত্র জারি করেন। এমনকি তিনি প্রেসিডেন্টকে অপসারণও করতে পারেন, তবে এক্ষেত্রে শর্ত থাকে যে, প্রধান বিচারপতি প্রেসিডেন্টকে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করবেন অথবা পার্লামেন্ট ৮৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে অযোগ্য ঘোষণা করবে।

সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক
সর্বোচ্চ নেতা ইরানের সকল সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর মধ্যে রয়েছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (যার স্থল, নৌ ও বিমান শাখা এবং কুদস ফোর্স অন্তর্ভুক্ত) এবং প্রচলিত সামরিক বাহিনী বা ‘আর্মি অব ইরান’। তিনি এসব বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ দেন এবং যুদ্ধ ঘোষণার একমাত্র ক্ষমতাও তাঁর। বাস্তবে, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের কিছু ক্ষমতা তিনি প্রেসিডেন্টকে অর্পণ করতে পারেন, তবে তা সংবিধান কর্তৃক সংরক্ষিত ক্ষমতাগুলোর বাইরে।

ইরানের সামরিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘বাসিজ’ নামে পরিচিত এক কোটিরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী। আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইসলামী বিপ্লবকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে এটি একটি স্বাধীন সংস্থা হলেও, পরে বিপ্লবী গার্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাসিজের প্রধানকেও সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ করেন। এই বাহিনীর প্রশাসনিক কর্মীরা রাষ্ট্রীয় বেতনে কাজ করলেও, সাধারণ স্বেচ্ছাসেবীরা বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দেন।

এছাড়াও, রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাখার মধ্যে কোনো মতবিরোধ দেখা দিলে সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে পরামর্শ করা হয়। সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের পরামর্শ নেওয়া হলেও, নেতার প্রভাব অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান নিয়োগের ক্ষমতাও তাঁর। তিনি বিচার বিভাগ কর্তৃক দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষমা করার ক্ষমতা রাখেন এবং চাইলে নিজের কিছু ক্ষমতা অন্য কাউকে অর্পণ করতে পারেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্টের

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা: রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু

আপডেট সময় : ০৬:১০:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

ইরানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সৃষ্ট এই পদটি ইরানের সর্বময় ক্ষমতার প্রতীক। বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনি রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাখেন, যা দেশের আইনসভা, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনকেও প্রভাবিত করে।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সফল পরিসমাপ্তির পর ইরানের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার পদটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই পদের প্রথম ধারক ছিলেন বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, যিনি ১৯৭৯ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইরানের সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু হলে বা পদত্যাগ করলে, নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিন সদস্যের একটি পরিষদ সাময়িকভাবে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয়।

ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সরকার মূলত আইনসভা, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসন—এই তিন ভাগে বিভক্ত। সংবিধানের ৫৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই প্রতিটি বিভাগই সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রের অভিভাবকত্বের অধীনে পরিচালিত হয়। যদিও ইরানের রাজনীতিতে বহুমুখী মতাদর্শের চর্চা রয়েছে, তবে জাতীয় নিরাপত্তা এবং ইসলামী বিপ্লবের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে সর্বোচ্চ নেতার পদটি শুরু থেকেই জনমত ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। সংবিধানে নেতার কাজের ওপর নজরদারি ও মতপ্রকাশের সুযোগ থাকলেও, সর্বোচ্চ নেতাকে প্রায়শই ইসলামী বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই তার বিরোধিতা করাকে বিপ্লবের বিরুদ্ধাচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।

ক্ষমতার পরিধি ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ
সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতার পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। সংবিধানের ৯১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তিনি গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ১২ জন সদস্যের মধ্যে ছয় জনকে মনোনীত করেন। এছাড়া ১৫৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে, দেশের প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর হাতে। রাষ্ট্রের সার্বিক নীতি নির্ধারণে তিনি এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং সমগ্র শাসনব্যবস্থা তদারকির ক্ষমতা রাখেন (১১০ অনুচ্ছেদ)। গণভোট ডাকার ক্ষমতাও সর্বোচ্চ নেতার এখতিয়ারভুক্ত।

ইরানের প্রেসিডেন্ট যদিও মন্ত্রীদের সহযোগিতায় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন (৬০ অনুচ্ছেদ), তবে সংবিধান যে ক্ষমতাগুলো সর্বোচ্চ নেতার জন্য সংরক্ষিত রেখেছে, সেগুলো বাদে। সর্বোচ্চ নেতা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর বিজয়ীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপত্র জারি করেন। এমনকি তিনি প্রেসিডেন্টকে অপসারণও করতে পারেন, তবে এক্ষেত্রে শর্ত থাকে যে, প্রধান বিচারপতি প্রেসিডেন্টকে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করবেন অথবা পার্লামেন্ট ৮৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে অযোগ্য ঘোষণা করবে।

সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক
সর্বোচ্চ নেতা ইরানের সকল সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর মধ্যে রয়েছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (যার স্থল, নৌ ও বিমান শাখা এবং কুদস ফোর্স অন্তর্ভুক্ত) এবং প্রচলিত সামরিক বাহিনী বা ‘আর্মি অব ইরান’। তিনি এসব বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ দেন এবং যুদ্ধ ঘোষণার একমাত্র ক্ষমতাও তাঁর। বাস্তবে, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের কিছু ক্ষমতা তিনি প্রেসিডেন্টকে অর্পণ করতে পারেন, তবে তা সংবিধান কর্তৃক সংরক্ষিত ক্ষমতাগুলোর বাইরে।

ইরানের সামরিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘বাসিজ’ নামে পরিচিত এক কোটিরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী। আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইসলামী বিপ্লবকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে এটি একটি স্বাধীন সংস্থা হলেও, পরে বিপ্লবী গার্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাসিজের প্রধানকেও সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ করেন। এই বাহিনীর প্রশাসনিক কর্মীরা রাষ্ট্রীয় বেতনে কাজ করলেও, সাধারণ স্বেচ্ছাসেবীরা বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দেন।

এছাড়াও, রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাখার মধ্যে কোনো মতবিরোধ দেখা দিলে সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে পরামর্শ করা হয়। সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের পরামর্শ নেওয়া হলেও, নেতার প্রভাব অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান নিয়োগের ক্ষমতাও তাঁর। তিনি বিচার বিভাগ কর্তৃক দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষমা করার ক্ষমতা রাখেন এবং চাইলে নিজের কিছু ক্ষমতা অন্য কাউকে অর্পণ করতে পারেন।