ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ নেতা, যিনি একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান এবং শিয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আধ্যাত্মিক কর্ণধার। এই পদটি দেশের সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি দ্বারা অলংকৃত, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর গঠিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ পদটিতে কে আসীন হবেন, তা নির্ধারণ করে আলেমদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ পরিষদ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ক্ষমতার পালাবদল
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার পদটি সৃষ্টি করা হয়। বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ১৯৭৯ সালের তেসরা ডিসেম্বর প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ নয় বছর ছয় মাস এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি দীর্ঘকাল এই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, আলী খামেনি যখন নির্বাচিত হয়েছিলেন, তখন তিনি ‘আয়াতুল্লাহ’ উপাধিধারী ছিলেন না, যা শিয়াদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হওয়ার জন্য প্রচলিত একটি শর্ত। তাকে এই পদে আনার জন্য পরবর্তীতে আইন পরিবর্তন করা হয়েছিল।
সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন পরিষদ: গঠন ও কার্যপদ্ধতি
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, কেবল একজন আয়াতুল্লাহ—যিনি শিয়াদের একজন উচ্চ পর্যায়ের ধর্মীয় নেতা—সর্বোচ্চ নেতা হতে পারেন। এই সর্বোচ্চ নেতাকে নির্বাচন করার দায়িত্বে থাকে ৮৮ জন আলেমের সমন্বয়ে গঠিত ‘সুপ্রিম লিডার্স কাউন্সিল’ বা ‘বিশেষজ্ঞদের পরিষদ’। প্রতি আট বছর পর ইরানের কোটি কোটি নাগরিক সরাসরি ভোটের মাধ্যমে এই পরিষদের সদস্যদের নির্বাচিত করেন। সর্বশেষ এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালে।
তবে, বিশেষজ্ঞদের পরিষদের সদস্য হতে চাইলে প্রথমে ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’-এর অনুমোদন প্রয়োজন। লক্ষণীয় যে, এই গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্যরা বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মনোনীত হয়ে থাকেন। এটি স্পষ্ট যে, সর্বোচ্চ নেতা গার্ডিয়ান কাউন্সিল এবং বিশেষজ্ঞদের পরিষদ—উভয়ের ওপরই ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। বিগত তিন দশকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই সংস্থাগুলোতে রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে এই পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ আলী মোহিদি কেরমানি, এবং ডেপুটি-চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন হাশেম হোসেইনি বুশেহরি ও আলী রেজা উর্ফি।
নির্বাচন ও ভোটাভুটির নিয়ম
নিয়ম অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞদের পরিষদের বৈঠক বৈধ হওয়ার জন্য অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের (অর্থাৎ ৫৯ জন) উপস্থিতি জরুরি। নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, যদি মাত্র ৫৯ জন সদস্য উপস্থিত থাকেন, তাহলে ৪০ ভোট পেলেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হতে পারেন।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই কমিশন
যাদের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে উপযুক্ত বিবেচনা করা হতে পারে, এমন সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগ্যতা পর্যালোচনার দায়িত্বে থাকে বিশেষজ্ঞদের পরিষদের একটি বিশেষ কমিশন। এই কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন গার্ডিয়ান কাউন্সিল অব জুরিসপ্রুডেন্সের সদস্য আহমদ হোসেইনি খোরাসানি; গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আলী রেজা উর্ফি ও মোহাম্মদ রেজা মাদ্রাসি ইয়াজদি; সর্বোচ্চ নেতার পরিষদের প্রথম সহ-সভাপতি হাশেম হোসেইনি বুশেহরি; ইউরোপে আয়াতুল্লাহ খামেনির সাবেক প্রতিনিধি মুহসেন মোহাম্মাদি আরাকি; ইসফাহানের শুক্রবারের ইমাম ও তিনবারের পরিষদ সদস্য আবুলহাসান মাহদাভি; এবং আরদাবিলের শুক্রবারের ইমাম হাসান আমোলি।
নির্বাচনে প্রয়োজনীয় সময়
নতুন সর্বোচ্চ নেতার নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারিত নেই। সাধারণত, এমন পরিস্থিতিতে তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী পরিষদ গঠিত হয়, যাতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি না হয়। তবে, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর যে ঘটনা ঘটেছিল, তা থেকে দেখা যায়—এ ধরনের পরিস্থিতিতে উত্তরসূরি নির্বাচনে বিশেষজ্ঞদের পরিষদ অপেক্ষাকৃত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ১৯৮৯ সালের ৪ জুন রাতে খোমেনির মৃত্যুর পরদিন সকালে সুপ্রিম লিডার্স কাউন্সিল বৈঠক ডেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার উত্তরসূরি নির্ধারণ করে।
রিপোর্টারের নাম 





















