## ভান্ডারিয়ায় সরিষা-গমের সোনালী বিপ্লব: কৃষকের মুখে স্বস্তির হাসি
ভান্ডারিয়া, পিরোজপুর: ভোজ্যতেলের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো এবং অল্প খরচে অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় চলতি মৌসুমে সরিষা ও গমের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকদের মাঝে আনন্দের বন্যা বইছে, কারণ এই সোনালী ফসল তাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। ভান্ডারিয়ার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সরিষার হলুদ চাদর এবং গমের সবুজে ছেয়ে যাওয়া দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের মন জয় করে নিচ্ছে।
অনুকূল আবহাওয়া ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সুফল
অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার এবং কৃষি বিভাগের নিরলস পরামর্শের ফলে এ বছর ভান্ডারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সরিষার আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে, কৃষকরা গম চাষেও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সরিষা ক্ষেতের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা। হলুদে মোড়ানো সরিষা ক্ষেতের মাঝে ছবি ও সেলফি তোলার ধুম লেগেছে। মৌমাছি, প্রজাপতি এবং নানা জাতের কীটপতঙ্গের আনাগোনা এবং মধু সংগ্রহের দৃশ্য পুরো পরিবেশকে এক মনোমুগ্ধকর রূপ দিয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য ও লক্ষ্যমাত্রার চিত্র
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত ভান্ডারিয়া উপজেলায় চলতি মৌসুমে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬০ হেক্টর জমি। তবে, কৃষকদের আগ্রহ এবং অনুকূল পরিস্থিতির কারণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় ৭০ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। অন্যদিকে, গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হেক্টর জমি, যা পূরণ হয়ে ১৯ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি প্রণোদনার আওতায় কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে উচ্চ ফলনশীল জাতের সরিষা ও গমের বীজ এবং সার বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৮ এবং বারি গম-৩৩ জাতের আবাদ সবচেয়ে বেশি হয়েছে।
কৃষকদের আশার আলো
ভান্ডারিয়ার কৃষক খলিলুর রহমান ফরাজী বলেন, “বর্তমানে ভোজ্যতেলের দাম অনেক বেশি। নিজেদের চাহিদা মেটানো এবং বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে এ বছর এক একর জমিতে বারি-১৪ জাতের সরিষার আবাদ করেছি, একই সঙ্গে গম চাষ করেছি। ফলন বেশ ভালো হয়েছে। আশা করছি ভালো লাভ করতে পারব।”
স্থানীয় কৃষক রিয়াজ উদ্দিন জানান, “এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় সরিষা ও গমের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ফলন বেশি হবে বলে আশা করছি। বাজারে দাম ভালো পেলে আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে।”
উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এবার সরিষার ফলন খুব ভালো হয়েছে। বিঘাপ্রতি ফলন বেশি পাওয়ার আশা করছি। যদি বাজারদর ঠিক থাকে তাহলে আমাদের ভালো লাভ হবে।”
অন্য এক কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “সরিষা চাষে খরচ তুলনামূলক কম। ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে সরিষা আবাদ করায় অতিরিক্ত আয় হচ্ছে। এতে সংসারের খরচ চালাতে সুবিধা হবে।”
সরিষা ও গম ক্ষেত দেখতে আসা কলেজছাত্রী আফরোজা আক্তার বলেন, “পুরো মাঠ হলুদ ফুলে ঢেকে গেছে। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে গেছি। অন্যদিকে গম ক্ষেতে সবুজে ঘেরা প্রকৃতি। ছবি তোলার জন্য দারুণ একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে।”
কৃষি কর্মকর্তার আশাবাদ
ভান্ডারিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, “চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে সরিষা ও গমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ বছর উপজেলার বিভিন্ন মাঠে উচ্চ ফলনশীল জাতের সরিষা ও গমের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে কৃষকদের রোগবালাই প্রতিরোধ এবং যথাযথ পরিচর্যা বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। আশা করছি, চলতি মৌসুমে সরিষা ও গম চাষে কৃষকরা ভালো ফলন পাবেন।”
এই বাম্পার ফলন ভান্ডারিয়ার কৃষকদের অর্থনৈতিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং একই সাথে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 




















