সীমান্তবর্তী জেলা সুনামগঞ্জের হাওর ও পাহাড়ঘেরা জনপদে বসবাসরত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা আজ অস্তিত্ব সংকটে। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাব, শিক্ষাব্যবস্থায় নিজস্ব ভাষার অন্তর্ভুক্তি না থাকা এবং সামাজিক উপহাস—এই তিনের প্রভাবে নতুন প্রজন্ম দ্রুত তাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সুনামগঞ্জের বুকে ধ্বনিত হওয়া এই ভাষাগুলো কেবলই স্মৃতিতে পরিণত হবে।
জেলা সদরের বাইরে ছাতক, দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর—এই চার উপজেলাতেই মূলত খাসিয়া, হাজং, গারো, চাকমাসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষের বাস। যুগ যুগ ধরে তারা ধারণ করে রেখেছেন নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। কিন্তু এই অমূল্য সম্পদ সংরক্ষণে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই বললেই চলে। অভিযোগ রয়েছে, ভাষা সংরক্ষণের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
স্থানীয় আদিবাসী নেতাদের lamentable অভিযোগ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে তাদের মাতৃভাষার কোনো বই বা অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর ফলে শিশুরা বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষাভিত্তিক শিক্ষায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে এবং নিজস্ব ভাষা চর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই প্রভাব কেবল বিদ্যালয় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নেই, বরং পারিবারিক পরিমণ্ডলেও মাতৃভাষার ব্যবহার ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।
একই চিত্র দেখা যায় শিক্ষার্থীদের মাঝেও। তাহিরপুর উপজেলার এক তরুণ শিক্ষার্থী জানায়, বিদ্যালয়ে নিজেদের ভাষায় কথা বললে সহপাঠীদের কাছ থেকে তাকে প্রায়ই কটূক্তি ও ঠাট্টার শিকার হতে হয়। এই সামাজিক বঞ্চনা ও অপমানের ভয়ে অনেকেই এখন নিজেদের ভাষা ব্যবহার করতে লজ্জা পায় এবং সংকোচ বোধ করে। প্রবীণদের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়। হাট-বাজার কিংবা জনসমাগমে মাতৃভাষায় কথা বললে তাদেরও উপহাসের মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
স্থানীয় আদিবাসী নেতা তুমুল মনে করেন, প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় অন্তত একটি করে মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হলে তা ভাষার প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে শিশুরা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে পারবে এবং মাতৃভাষার সঙ্গে তাদের সংযোগ অটুট থাকবে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক এন্ড্রো সলোমাও একই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সীমান্তবর্তী এই উপজেলাগুলোতে ভাষা চর্চা কেন্দ্র স্থাপন এবং পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, এই অমূল্য ভাষিক ঐতিহ্যগুলো কেবল ইতিহাসের পাতায়ই স্থান পাবে, বাস্তবে তাদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
—
রিপোর্টারের নাম 




















