বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বনদস্যুদের নির্মূলে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) থেকে দস্যুমুক্ত সুন্দরবন গড়তে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে এক বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। বন থেকে দস্যুতা পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সারাদেশে প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিয়েছে দস্যু চক্রগুলো। বনের বিভিন্ন নদী ও খালে মাছ ধরতে যাওয়া সাধারণ জেলেদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী জেলেরা জানিয়েছেন, সশস্ত্র দস্যুরা ট্রলার আটকে জেলেদের অপহরণ করছে এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে। মুক্তিপণ দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা দেরি হলে শারীরিক নির্যাতনসহ ট্রলার ছিনিয়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
দস্যুদের এমন আকস্মিক তৎপরতায় উপকূলীয় জনপদে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক জেলে জীবন ও জীবিকার ভয়ে গভীর বনে মাছ বা কাঁকড়া আহরণে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। এর ফলে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার শ্রমজীবী পরিবারের উপার্জনে টান পড়েছে, দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সুন্দরবনের দুবলার চর, শিবসা, পশুর, আড়পাঙ্গাশিয়া ও চাঁদপাই রেঞ্জসহ গুরুত্বপূর্ণ নদীপথগুলোতে নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। অভিযানে জলপথে দ্রুতগামী টহল নৌযান ও স্পিড-বোটের পাশাপাশি বিশেষায়িত কমান্ডো টিম মোতায়েন করা হয়েছে। দস্যুদের সম্ভাব্য অবস্থান ও গোপন আস্তানা শনাক্ত করতে কাজ করছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।
নৌবাহিনীর একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সুন্দরবনে কোনো ধরনের অপরাধী চক্রকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, উপকূলীয় এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহভাজন নৌযানগুলোতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
র্যাব ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে দস্যুদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে বনের গহীন অঞ্চলে চিরুনি অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাগুলো।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, অতীতে দস্যুদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও সম্প্রতি কিছু বিচ্ছিন্ন চক্র পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে তারা আশাবাদী। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ রাখতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বনজীবীদের টেকসই বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি।
জেলেদের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং নির্ভয়ে বনজ সম্পদ আহরণের পরিবেশ নিশ্চিত করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। যৌথ বাহিনীর এই বিশেষ তৎপরতা উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তায় কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
রিপোর্টারের নাম 






















