ঢাকা ০৬:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে জ্ঞানের আলো: রুমার পিছিয়ে পড়া জনপদ বদলে দিচ্ছে ‘মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার’

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:২২:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বান্দরবানের রুমা উপজেলার অত্যন্ত দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা ৩৬৬ নম্বর সেংগুম মৌজা। এক সময় যেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছানো ছিল এক দুঃসাধ্য কল্পনা, সেখানে এখন বইয়ের পাতায় নতুন স্বপ্ন বুনছে পাহাড়ের শিশুরা। ২০১৫ সালে শিশুসাহিত্যিক কাজী মোহিনী ইসলামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার’ এখন সেই জনপদে কেবল একটি পাঠাগার নয়, বরং সামাজিক ও মানবিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী বাতিঘর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ভৌগোলিক প্রতিকূলতার কারণে রুমার এই অঞ্চলটি মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। দারিদ্র্য আর সচেতনতার অভাবে এখানকার জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ নিরক্ষর। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো গ্রাম থেকে দূরে হওয়ায় দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে শিশুরা স্কুলে যেতে নিরুৎসাহিত হতো। ফলে অল্প বয়সেই অনেক কিশোর অপরাধ ও মাদকাসক্তির মতো পথে পা বাড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করত। এমন এক কঠিন সময়ে মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার এই জনপদে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

পাঠাগারটি প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে সরাসরি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে জ্ঞানের আলো। পাঠকদের বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে বিজ্ঞান ও সৃজনশীল সাহিত্যবিষয়ক বই। এর মূল লক্ষ্য হলো—স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তোলা এবং একটি মননশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা।

শিক্ষার পাশাপাশি এই পাঠাগারটি মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেও নানা কাজ করে যাচ্ছে। পাঠাগারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বেশ কিছু সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোর বর্তমানে ঢাকার সরকারি শিশু বিকাশ কেন্দ্রে থেকে উন্নত পরিবেশে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছে। যারা কোনোদিন বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত ছিল না, তাদের অক্ষরজ্ঞান দানের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় যুক্ত করার নিরন্তর কাজ চলছে এখানে। এছাড়া শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি পাঠাগারের উদ্যোগে এক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যেখানে এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোর ও প্রবীণদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা পেতে নতুন পোশাক পেয়ে শিশুদের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা যায়। অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল ‘আনন্দ ভোজন’, যা পুরো এলাকায় এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করে।

পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কাজী মোহিনী ইসলাম নিজে উপস্থিত থেকে এসব উপহার সামগ্রী বিতরণ করেন। তিনি মনে করেন, কেবল বই বিতরণ নয়, বরং ভালোবাসা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। দুর্গম পাহাড়ের বুক চিরে মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার যে আলোর মশাল জ্বেলেছে, তা আগামী দিনে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে বলে স্থানীয়রা আশা করছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভরাডুবি: ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হওয়ার ঝুঁকিতে শ্রীলঙ্কা, সাঙ্গাকারার কড়া হুঁশিয়ারি

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে জ্ঞানের আলো: রুমার পিছিয়ে পড়া জনপদ বদলে দিচ্ছে ‘মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার’

আপডেট সময় : ০১:২২:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বান্দরবানের রুমা উপজেলার অত্যন্ত দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা ৩৬৬ নম্বর সেংগুম মৌজা। এক সময় যেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছানো ছিল এক দুঃসাধ্য কল্পনা, সেখানে এখন বইয়ের পাতায় নতুন স্বপ্ন বুনছে পাহাড়ের শিশুরা। ২০১৫ সালে শিশুসাহিত্যিক কাজী মোহিনী ইসলামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার’ এখন সেই জনপদে কেবল একটি পাঠাগার নয়, বরং সামাজিক ও মানবিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী বাতিঘর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ভৌগোলিক প্রতিকূলতার কারণে রুমার এই অঞ্চলটি মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। দারিদ্র্য আর সচেতনতার অভাবে এখানকার জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ নিরক্ষর। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো গ্রাম থেকে দূরে হওয়ায় দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে শিশুরা স্কুলে যেতে নিরুৎসাহিত হতো। ফলে অল্প বয়সেই অনেক কিশোর অপরাধ ও মাদকাসক্তির মতো পথে পা বাড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করত। এমন এক কঠিন সময়ে মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার এই জনপদে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

পাঠাগারটি প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে সরাসরি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে জ্ঞানের আলো। পাঠকদের বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে বিজ্ঞান ও সৃজনশীল সাহিত্যবিষয়ক বই। এর মূল লক্ষ্য হলো—স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তোলা এবং একটি মননশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা।

শিক্ষার পাশাপাশি এই পাঠাগারটি মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেও নানা কাজ করে যাচ্ছে। পাঠাগারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বেশ কিছু সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোর বর্তমানে ঢাকার সরকারি শিশু বিকাশ কেন্দ্রে থেকে উন্নত পরিবেশে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছে। যারা কোনোদিন বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত ছিল না, তাদের অক্ষরজ্ঞান দানের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় যুক্ত করার নিরন্তর কাজ চলছে এখানে। এছাড়া শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি পাঠাগারের উদ্যোগে এক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যেখানে এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোর ও প্রবীণদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা পেতে নতুন পোশাক পেয়ে শিশুদের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা যায়। অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল ‘আনন্দ ভোজন’, যা পুরো এলাকায় এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করে।

পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কাজী মোহিনী ইসলাম নিজে উপস্থিত থেকে এসব উপহার সামগ্রী বিতরণ করেন। তিনি মনে করেন, কেবল বই বিতরণ নয়, বরং ভালোবাসা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। দুর্গম পাহাড়ের বুক চিরে মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার যে আলোর মশাল জ্বেলেছে, তা আগামী দিনে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে বলে স্থানীয়রা আশা করছেন।