## নতুন স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন: ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের অপেক্ষায় দেশ
ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আগামী ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে। তবে, পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকারের কারাবাসের কারণে উদ্বোধনী অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে, দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
অধিবেশনের সভাপতিত্ব কে করবেন?
সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই দুই পদই শূন্য। তাই, প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন তা নিয়ে নানা আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা চলছে।
সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “বর্তমানে বিগত সংসদের স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোন ব্যক্তিকে দিয়ে অধিবেশন শুরু করাতে হবে।” তিনি আরও জানান, কার্যপ্রণালী বিধির (৫) ধারা অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুইজনই অনুপস্থিত থাকলে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি অধিবেশন পরিচালনা করতে পারেন। এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাবিত হতে পারে।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ-সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে স্পিকার ও একজনকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে হয়। এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য স্পিকার পদের জন্য অন্য একজন সংসদ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন এবং অন্য একজন সংসদ সদস্য সেই প্রস্তাবে সমর্থন জানাবেন। প্রস্তাবিত ব্যক্তি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনে সম্মত আছেন এমন বিবৃতিও নোটিশের সাথে জমা দিতে হবে। এরপর এটি সংসদ সদস্যদের মধ্যে ভোটাভুটিতে যাবে। সাধারণত, স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন হয়।
তবে, যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একাধিক প্রার্থী না থাকে, তবে কণ্ঠভোটের মাধ্যমেই তারা নির্বাচিত হতে পারেন। নিয়ম অনুযায়ী, এই নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অধিবেশন মুলতবী ঘোষণা করা হবে এবং রাষ্ট্রপতি নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। এরপর তাদের সভাপতিত্বেই সংসদের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।
নতুন সরকার ও বিরোধী দলের কাঠামো
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করার পর বিএনপি সরকার গঠন করেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন এবং ওইদিনই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সংসদীয় টিমের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী-এনসিপি জোট জামায়াত আমির শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করেছেন। বিরোধী দলীয় উপনেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
হুইপের ভূমিকা
জাতীয় সংসদে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার পদের পর সরকারি ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ বা হুইপ পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিফ হুইপ হলেন সংসদে সরকারি দলের মুখপাত্র। তার সাথে কয়েকজন হুইপও থাকেন, যারা সংসদ সদস্যের মধ্যেই নির্বাচিত হন। চিফ হুইপ ও হুইপের প্রধান কাজ সংসদে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা। তারা নিজ দলের সদস্যদের পার্লামেন্টে নিয়মিত হাজির করা, বিল উত্থাপিত হলে দলের পক্ষে ভোট নিশ্চিত করা এবং সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
আইন অনুযায়ী, চিফ হুইপ ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পদ একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদার অধিকারী। এতে বিরোধীদলীয় নেতা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
সংবিধানের বিধান ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বা পদশূন্য না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের পদে বহাল থাকবেন। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত তারা আগের পদেই বহাল থাকবেন। নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সংসদ অধিবেশন শুরু হলে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথগ্রহণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কার্যকালের অবসান ঘটবে।
তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকারের কারাবাস একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। এই অবস্থায়, রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়া এবং এরপর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথগ্রহণের মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হবে।
রিপোর্টারের নাম 






















