ফিলিস্তিনি ফুটবল অঙ্গনের একদল ক্রীড়াবিদ, ক্লাব এবং অধিকারকর্মী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) ফুটবল বিশ্বের দুই প্রভাবশালী সংগঠন ফিফা ও উয়েফার শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ দায়ের করেছেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি জমা দেওয়া ১২০ পৃষ্ঠার একটি আবেদনে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফানতিনো এবং উয়েফা প্রেসিডেন্ট আলেক্সজান্ডার সেফেরিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধে সহায়তা ও প্ররোচনা, বিশেষত দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বেসামরিক জনগোষ্ঠী স্থানান্তর এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ, যেমন বর্ণবৈষম্যে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। ক্রীড়া প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এমন অভিযোগ নজিরবিহীন। অভিযোগকারীদের মতে, এই মামলা ইসরায়েলের দখলদারিত্ব, বর্ণবাদ ও সম্ভাব্য গণহত্যা সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচশ কোটি মানুষের সমর্থিত একটি অন্যতম শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রকাশমাধ্যম। এই মামলার আইনি তাৎপর্য অনেক সুদূরপ্রসারী, যা কেবল ক্রীড়া প্রশাসনের ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও জবাবদিহিতার নজির স্থাপনেও ভূমিকা রাখতে পারে। গাজায় চলমান সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ‘অ্যাথলেটিসাইড’ বা ক্রীড়াবিনাশের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ইসরায়েলি হামলায় ১,০০৭ জন ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন এবং ১৮৪টি ক্রীড়া স্থাপনা ধ্বংস ও ৮১টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যদিও এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য সরাসরি ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে দায়ী করা হয়নি, তবে দখলকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি-ভিত্তিক ক্লাবগুলোর কার্যক্রম এবং তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়াকে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও বর্ণবাদী নীতিকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করার সামিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এই গুরুতর অভিযোগ সত্ত্বেও, ফিফা বা উয়েফা এই ক্লাবগুলোর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফানতিনো ইসরায়েলি দলগুলোকে বিশ্ব ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে মত প্রকাশ করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডের জন্য সে দেশের ফুটবল দলকে নিষিদ্ধ করা উচিত নয় এবং এই নীতি ফিফার বিধিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
তবে ইনফানতিনোর এই বক্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তার এই মন্তব্যের সমালোচনা করে বলা হচ্ছে যে, ২০২২ সালে রাশিয়া এবং ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর ক্রিমিয়ান ক্লাবগুলোর ওপর উয়েফা-সংযুক্ত রুশ লিগে খেলার নিষেধাজ্ঞা জারির নজির রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিয়ম অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি আসামি করা যায় না। তাই এই অভিযোগটি সংগঠনগুলোর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো, ফিফা কর্তৃক দখলকৃত পশ্চিম তীরের বসতি এলাকায় অবস্থিত ক্লাবগুলোকে স্বীকৃতি, আর্থিক সহায়তা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া। ফিফা বিধির ৬৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্য সংস্থা অন্য সদস্যের ভূখণ্ডে তাদের অনুমতি ছাড়া খেলতে পারে না। অভিযোগকারীদের মতে, বসতি-ভিত্তিক ক্লাবগুলোর কার্যক্রম চালু রাখার মাধ্যমে অবৈধ বসতিগুলোকে স্বাভাবিকীকরণ করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ২০২৪ সালের ঘোষণার পরিপন্থী। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও এক প্রস্তাবে বসতিগুলোকে “অবৈধ” ঘোষণা করে ইসরায়েলকে নতুন বসতি স্থাপন বন্ধ ও দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
রোম সংবিধির ৮(২)(বি)(৮) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দখলকৃত ভূখণ্ডে বেসামরিক জনগোষ্ঠী স্থানান্তর যুদ্ধাপরাধের শামিল। অভিযোগকারীদের মতে, পশ্চিম তীরের বসতি-ভিত্তিক ক্লাবগুলোর অনুমোদন এই স্থানান্তরকে উৎসাহিত করে। একইভাবে, এসব ক্লাবে ফিলিস্তিনিদের খেলতে, পরিচালনা করতে বা দর্শক হিসেবে প্রবেশে বাধা দেওয়া হলে তা রোম সংবিধির ৭(১)(জে) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্ণবৈষম্যমূলক মানবতাবিরোধী অপরাধের সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বর্তমানে, অভিযোগটি আইসিসির প্রসিকিউটর দপ্তর প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করবে যে আদালতের এখতিয়ার, গ্রহণযোগ্যতা এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থ পূরণ হয়েছে কিনা। যদি তদন্ত শুরুর সিদ্ধান্ত হয়, তবে প্রমাণ সংগ্রহের পর গ্রেপ্তারী পরোয়ানা বা সমন জারি হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি পদক্ষেপ নজির স্থাপন করবে এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়াকে নতুন গতি দেবে।
ফুটবল বিশ্বজুড়ে কেবল একটি খেলা নয়, এটি বিপুল অর্থ ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। ফিফা ও উয়েফা বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তাদের বিধিবিধান অনেকাংশে রাষ্ট্রীয় আইনের মতোই প্রভাব বিস্তার করে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা থেকে এর গভীরতা অনুধাবন করা যায়। জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ প্রতিবেদনকারী মাইকেল লাইনেক বলেন, “দখলদার শক্তি যখন স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, তখন রাষ্ট্র, করপোরেশন ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাসহ বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা। অথচ বসতি-ভিত্তিক ক্লাবগুলোকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দিয়ে ফিফা ও উয়েফা অবৈধ দখলকে ‘স্পোর্টসওয়াশিং’-এর মাধ্যমে বৈধতা দিচ্ছে, যা ন্যায় ও সমতার নীতির পরিপন্থী।”
সমালোচকদের মতে, ক্রীড়া কখনোই রাজনীতির বাইরে ছিল না। ‘রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা’র আড়ালে আসলে ক্ষমতা ও প্রভাবের রাজনীতি কাজ করে। এখন প্রশ্ন একটাই— কেউ বা কোনো সংস্থাই আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সেই বার্তা কতটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে, সেই অপেক্ষায় আছে বিশ্ব।
রিপোর্টারের নাম 

























