আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে জুলাই গণহত্যার বিচারকাজের ধারাবাহিকতা ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর অনুবিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। নবনিযুক্ত চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম অ্যাটর্নি জেনারেলের পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তার গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জে এবং এর আগে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত দেড় বছরে বিচারিক কার্যক্রমে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পরবর্তী সময়ে জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার শুরু করা এবং শেখ হাসিনাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও দণ্ড নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সাহসী ও পেশাদার ভূমিকা পালন করেছেন। তার দায়িত্ব পালনকালেই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হয় এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া গতি পায়।
বিদায় বেলায় এক সংবাদ সম্মেলনে তাজুল ইসলাম বলেন, “রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে প্রশাসনিক রদবদল স্বাভাবিক। আমি আশা করি, নতুন যিনি দায়িত্ব নিচ্ছেন তিনি ভুক্তভোগী ও বিচারপ্রার্থী মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাজ করবেন।” তিনি আরও বলেন, এই বিচারের মাধ্যমে এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কখনোই গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারার মতো ঘটনা না ঘটে।
তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন টিমের অর্জন অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। তাদের প্রচেষ্টায় ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এ এ পর্যন্ত ২৪টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ মোট ২৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের হত্যা মামলাসহ আরও দুটি মামলা বর্তমানে রায়ের অপেক্ষায় (সিএভি) রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিচারাধীন ২১টি মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৪৫৭ জন। এর মধ্যে ১৬১ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন এবং ২৯৩ জন পলাতক। আসামিদের তালিকায় আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপি ছাড়াও সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রয়েছেন। বিশেষ করে ‘আয়নাঘর’ বা গুমের ঘটনার তদন্ত ও বিচার শুরু করা ছিল তাজুল ইসলামের আমলের অন্যতম বড় সাফল্য।
গতকাল সোমবার দুপুরে দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা হবে, তবে প্রকৃত অপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে প্রসিকিউশন বদ্ধপরিকর। নির্বাচিত সরকারের অধীনে বিচারপ্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তাজুল ইসলামের বিদায় এবং আমিনুল ইসলামের দায়িত্ব গ্রহণ—এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন এক নতুন অধ্যায়ে পদার্পণ করল। দেশবাসীর প্রত্যাশা, নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও জুলাই গণহত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত হবে না।
রিপোর্টারের নাম 






















