ইসলামের ইতিহাসের এক সংকটময় মুহূর্তে খলিফা আবু বকর (রা.)-এর দৃঢ়তা ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিল। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ সময়ে ফিলিস্তিন ও বালকা অভিমুখে যে সৈন্যবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়নে অটল ছিলেন প্রথম খলিফা। সাহাবিদের একাংশের সংশয় কিংবা আনসারদের দাবি—কোনো কিছুই তাকে রাসুলের (সা.) নির্দেশ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তার কাছে রাসুলের (সা.) আমানত রক্ষা করাই ছিল সর্বপ্রধান অগ্রাধিকার।
তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য প্রস্তুত হলো উসামা ইবনে জায়েদের নেতৃত্বাধীন বাহিনী। মদিনার উপকণ্ঠে বাহিনীর বিদায়লগ্নে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। তরুণ সেনাপতি উসামা (রা.) ছিলেন ঘোড়ার পিঠে, আর ইসলামের খলিফা আবু বকর (রা.) তাঁর পাশে পায়ে হেঁটে পথ চলছিলেন। এই বিনয় ও সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে খলিফা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, যোগ্যতার মাপকাঠিতে নিযুক্ত নেতার আনুগত্যই ইসলামের মূল শিক্ষা।
যাত্রার প্রাক্কালে খলিফা আবু বকর (রা.) মুসলিম সেনাদের উদ্দেশে যুদ্ধের যে ১০টি মূলনীতি ঘোষণা করেন, তা আজও আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিধির ইতিহাসে এক অনন্য দলিল হয়ে আছে। তিনি নির্দেশ দেন—বিশ্বাসঘাতকতা, লুণ্ঠন বা অঙ্গহানি করা যাবে না; হত্যা করা যাবে না কোনো নারী, শিশু বা বৃদ্ধকে। এমনকি পরিবেশ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় ফলদ বৃক্ষ নিধন এবং প্রয়োজন ছাড়া গবাদি পশু জবাইয়েও তিনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। উপাসনালয়ে মগ্ন সাধু-সন্ন্যাসীদের উত্ত্যক্ত না করার নির্দেশ দিয়ে তিনি ইসলামের পরমতসহিষ্ণুতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
রণকৌশল ও অভিযানের সফলতার দিকে তাকালে দেখা যায়, মদিনার উপকণ্ঠ থেকে যাত্রা শুরু করে উসামার বাহিনী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তারা ‘আবনা’ নামক স্থানে পৌঁছান। সেখানে সেনাপতি উসামা (রা.) তাঁর বাহিনীকে ঈমানি চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে বলেন, “শত্রুর সংখ্যা বা শক্তি দেখে বিচলিত হওয়া যাবে না; বরং ঐক্যবদ্ধ থেকে আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।” মুসলিম বাহিনীর অতর্কিত ও সুশৃঙ্খল আক্রমণে রোমান বাহিনী পর্যুদস্ত হয়। এই অভিযানে কোনো মুসলিম সদস্যের প্রাণহানি ছাড়াই বিপুল বিজয় ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জিত হয়। মদিনা থেকে যাত্রার প্রায় ৪০ থেকে ৭০ দিনের মাথায় তারা বীরবেশে ফিরে আসেন।
উসামার এই অভিযান কেবল একটি সামরিক জয় ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা। খলিফা আবু বকর (রা.) বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নেতার প্রয়াণে ইসলামের অগ্রযাত্রা থেমে থাকে না। নবীজির ইন্তেকালের পর উদ্ভূত অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও মাত্র তিন দিনের মাথায় এই দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, ইসলাম কোনো ব্যক্তিবিশেষের ওপর নয়, বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এই অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণ নেতৃত্বের ওপর আস্থা। মাত্র ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী একজন যুবককে বিশ্বের তৎকালীন প্রধান শক্তির বিরুদ্ধে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে রাসুল (সা.) এবং পরবর্তীতে আবু বকর (রা.) এক যুগান্তকারী উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। বয়সে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাহাবিদের উপস্থিতিতেও উসামার নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে খলিফা শিখিয়েছেন যে, যোগ্যতাই নেতৃত্বের প্রধান শর্ত। এমনকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে মদিনায় রাখার জন্য খলিফা আবু বকর (রা.) সেনাপতি উসামার কাছে বিনীতভাবে অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন। এটি ছিল নেতার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মানের বহিঃপ্রকাশ, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক অবিস্মরণীয় আদর্শ হয়ে আছে।
রিপোর্টারের নাম 
























