ঢাকা ০৫:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারুণ্যের প্রযুক্তি-প্রত্যাশা: নতুন সরকারের কাছে পঞ্চদফা দাবি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৫৩:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের হাত ধরে বাংলাদেশ এখন এক নতুন দিগন্তে পা রেখেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ এবং অনলাইন উদ্যোক্তা কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ তরুণ নিজেদের স্বপ্ন বুনছে, যা অর্থনীতিতে যোগ করছে নতুন মাত্রা। তথ্যপ্রযুক্তি খাত শুধু কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্তই খুলে দেয়নি, বরং বৈদেশিক আয়ের একটি বড় উৎস হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই আধুনিকায়নের ধারায়, নতুন সরকারের কাছে তরুণ প্রজন্মের সুস্পষ্ট প্রত্যাশা – একটি প্রযুক্তিবান্ধব, দক্ষতানির্ভর এবং ভবিষ্যৎমুখী নীতিমালা, যা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথ প্রশস্ত করবে।

দেশের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ প্রযুক্তি খাতে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী হলেও, মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার অভাবে তারা প্রায়শই পিছিয়ে পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে, নতুন সরকারের কাছে তরুণদের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আধুনিক আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম অনুসরণ এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তোলা সম্ভব। বিশেষ করে, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিকস ডিজাইন, প্রোগ্রামিং, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফ্রিল্যান্সারদের অবদান দিন দিন বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে, সহজ ব্যাংকিং সহায়তা এবং আর্থিক লেনদেনের জটিলতা তাদের পথচলায় বড় বাধা। এ অবস্থায়, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বৈদেশিক আয় গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করা, সরকারি স্বীকৃতি ও প্রণোদনা চালু করা এবং ডিজিটাল আয়ের একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি করা নতুন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এটি কেবল তাদের কর্মপরিবেশ উন্নত করবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

প্রযুক্তিনির্ভর কাজের জন্য দ্রুত ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ অপরিহার্য। তবে গ্রাম ও শহরের মধ্যে ইন্টারনেটের গতি ও মানে এখনো লক্ষণীয় বৈষম্য বিদ্যমান, যা প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। সারা দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ তরুণরাও সমানভাবে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশ নিতে পারবে এবং শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমবে।

নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করা তরুণ উদ্যোক্তারা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কিন্তু ফান্ডিং, মেন্টরশিপ এবং ইনকিউবেশন সুবিধার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ মাঝপথেই থেমে যায়। সরকার যদি স্টার্টআপ ফান্ড বৃদ্ধি করে, কর ছাড় দেয়, প্রযুক্তি পার্কের সম্প্রসারণ ঘটায় এবং উদ্ভাবনী প্রকল্পে অনুদান বাড়ায়, তবে দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা বিকশিত হবেন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির বাস্তবমুখী অন্তর্ভুক্তি এখন সময়ের দাবি। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই কোডিং, ডিজিটাল স্কিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অনলাইন আয়ের মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠবে। একইসঙ্গে, প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাইবার ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা, অনলাইন উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা নতুন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শক্তিশালী সাইবার আইন প্রণয়ন ও সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা এই ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ, আর এই তরুণ শক্তিই দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। নতুন সরকার যদি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে একটি স্মার্ট, দক্ষ এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তরুণদের প্রত্যাশা কেবল সুযোগের নয়, বরং এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের যেখানে দক্ষতা হবে সফলতার মূল চাবিকাঠি এবং তথ্যপ্রযুক্তিই হবে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অভয়নগরে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ, আহত অন্তত ৭; রণক্ষেত্র ভাটপাড়া বাজার

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারুণ্যের প্রযুক্তি-প্রত্যাশা: নতুন সরকারের কাছে পঞ্চদফা দাবি

আপডেট সময় : ০২:৫৩:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের হাত ধরে বাংলাদেশ এখন এক নতুন দিগন্তে পা রেখেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ এবং অনলাইন উদ্যোক্তা কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ তরুণ নিজেদের স্বপ্ন বুনছে, যা অর্থনীতিতে যোগ করছে নতুন মাত্রা। তথ্যপ্রযুক্তি খাত শুধু কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্তই খুলে দেয়নি, বরং বৈদেশিক আয়ের একটি বড় উৎস হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই আধুনিকায়নের ধারায়, নতুন সরকারের কাছে তরুণ প্রজন্মের সুস্পষ্ট প্রত্যাশা – একটি প্রযুক্তিবান্ধব, দক্ষতানির্ভর এবং ভবিষ্যৎমুখী নীতিমালা, যা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথ প্রশস্ত করবে।

দেশের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ প্রযুক্তি খাতে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী হলেও, মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার অভাবে তারা প্রায়শই পিছিয়ে পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে, নতুন সরকারের কাছে তরুণদের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আধুনিক আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম অনুসরণ এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তোলা সম্ভব। বিশেষ করে, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিকস ডিজাইন, প্রোগ্রামিং, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফ্রিল্যান্সারদের অবদান দিন দিন বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে, সহজ ব্যাংকিং সহায়তা এবং আর্থিক লেনদেনের জটিলতা তাদের পথচলায় বড় বাধা। এ অবস্থায়, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বৈদেশিক আয় গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করা, সরকারি স্বীকৃতি ও প্রণোদনা চালু করা এবং ডিজিটাল আয়ের একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি করা নতুন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এটি কেবল তাদের কর্মপরিবেশ উন্নত করবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

প্রযুক্তিনির্ভর কাজের জন্য দ্রুত ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ অপরিহার্য। তবে গ্রাম ও শহরের মধ্যে ইন্টারনেটের গতি ও মানে এখনো লক্ষণীয় বৈষম্য বিদ্যমান, যা প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। সারা দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ তরুণরাও সমানভাবে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশ নিতে পারবে এবং শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমবে।

নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করা তরুণ উদ্যোক্তারা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কিন্তু ফান্ডিং, মেন্টরশিপ এবং ইনকিউবেশন সুবিধার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ মাঝপথেই থেমে যায়। সরকার যদি স্টার্টআপ ফান্ড বৃদ্ধি করে, কর ছাড় দেয়, প্রযুক্তি পার্কের সম্প্রসারণ ঘটায় এবং উদ্ভাবনী প্রকল্পে অনুদান বাড়ায়, তবে দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা বিকশিত হবেন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির বাস্তবমুখী অন্তর্ভুক্তি এখন সময়ের দাবি। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই কোডিং, ডিজিটাল স্কিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অনলাইন আয়ের মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠবে। একইসঙ্গে, প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাইবার ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা, অনলাইন উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা নতুন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শক্তিশালী সাইবার আইন প্রণয়ন ও সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা এই ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ, আর এই তরুণ শক্তিই দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। নতুন সরকার যদি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে একটি স্মার্ট, দক্ষ এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তরুণদের প্রত্যাশা কেবল সুযোগের নয়, বরং এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের যেখানে দক্ষতা হবে সফলতার মূল চাবিকাঠি এবং তথ্যপ্রযুক্তিই হবে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি।