প্রযুক্তি যখন পৃথিবীকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, ঠিক তখনই কেড়ে নিচ্ছে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—‘মনোযোগ’। আজ বিশ্বায়নের এই যুগে আমরা যখন হাতের মুঠোয় সবকিছু পাচ্ছি, তখন একটি অদৃশ্য শক্তি আমাদের অজান্তেই গ্রাস করছে। ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস বা টিকটকের মতো ১৫-৬০ সেকেন্ডের ছোট ছোট ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলো মুহূর্তেই কেড়ে নিচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়। এই ‘শর্ট-ভিডিও’ সংস্কৃতি মস্তিষ্কে যে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক এবং এর ভয়াবহতা এখনো পুরোপুরি অনুধাবন করা যাচ্ছে না।
এক দশক আগেও একজন মানুষ যেখানে ৩০-৪০ মিনিট টানা মনোযোগ দিয়ে কোনো বিষয় পড়তে বা শুনতে পারতেন, এখন মাত্র ৫-১০ মিনিটের মধ্যেই অস্থিরতা দেখা যায়। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে এর প্রকোপ ভয়াবহ। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মন না বসা, বই পড়তে গিয়ে বারবার ফোন চেক করার মতো বাজে অভ্যাস এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
ডিজিটাল ড্রাগ ও ডোপামিন লুপ
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শর্ট ভিডিওগুলো মস্তিষ্কে ‘ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তুষ্টি তৈরি করে। প্রতিটি নতুন ভিডিও দেখার পর মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক এক ধরনের নিউরোট্রান্সমিটারের ক্ষরণ ঘটে। এটি অনেকটা মাদকাসক্তির মতোই আসক্তি তৈরি করে। একবার স্ক্রল করা শুরু করলে মস্তিষ্ক পরবর্তী ‘হিটের’ জন্য ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে, যা আমাদের অবচেতন মনকে ‘আরো একটি ভিডিও’ দেখার নেশায় বুঁদ করে রাখে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘ডোপামিন লুপ’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
অনর্থক কনটেন্টের জোয়ার
এই প্ল্যাটফর্মগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো কনটেন্টের নিম্নমান। ভাইরাল হওয়ার নেশায় মানুষ প্রতিদিন কুরুচিপূর্ণ, হাস্যকর এবং অর্থহীন ভিডিও তৈরি করছে। এমন ভিডিও একের পর এক দেখতে দেখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অজান্তেই নষ্ট হয়ে যায়। শিশু-কিশোররা তো বটেই, প্রাপ্তবয়স্করাও এই ফাঁদে পড়ছেন নিয়মিত। পড়াশোনা, আত্মোন্নয়ন, পরিবার বা বিশ্রামের জন্য যে মূল্যবান সময় ব্যয় হওয়ার কথা, তা চলে যাচ্ছে ফালতু স্ক্রলিংয়ে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে সময় ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা, কাজের প্রতি অনীহা ও লক্ষ্যহীনতা।
শিশু-কিশোরদের ঝুঁকি ও সৃজনশীলতার মৃত্যু
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন গড়পড়তা কিশোর দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা ব্যয় করছে এসব রিলস বা শর্টস দেখে, যার অধিকাংশই অনর্থক। এর ফলে ভবিষ্যৎ এক অসুস্থ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে আমাদের সমাজে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্য মানুষের অর্থহীন কর্মকাণ্ড (যেমন রান্না, খাওয়া, গাড়িতে চড়া, পুতুল খেলা ইত্যাদি) দেখে সময় কাটানোর ফলে শিশু-কিশোরদের নিজস্ব চিন্তা করার ক্ষমতা এবং বই পড়ার মতো গভীর কাজ করার ধৈর্য হারিয়ে যাচ্ছে।
মনোযোগের সংকট ও ‘টিকটক ব্রেইন’
মাইক্রোসফটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের গড় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা (Attention Span) ১২ সেকেন্ড থেকে কমে মাত্র ৮ সেকেন্ডে দাঁড়িয়েছে; যা একটি গোল্ডফিশের মনোযোগের ক্ষমতা ৯ সেকেন্ডের চেয়েও কম! বিশেষজ্ঞরা এই অবস্থাকে ‘টিকটক ব্রেইন’ সিন্ড্রোম হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। দীর্ঘক্ষণ কোনো একটি বিষয়ে চিন্তা করার বা মনোযোগী হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে মানুষ। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে কোনো বিষয়ের গভীরতা থাকে না। ফলে মানুষ খণ্ডিত এবং অনেক সময় ভুল তথ্য নিয়ে সামাজিকভাবে বা রাজনৈতিকভাবে প্রোপাগান্ডা ছড়ায়, যা সমাজে বিপদ ডেকে আনে। সারাদিন শত শত ভিডিও দেখার ফলে মস্তিষ্ক কোনো তথ্যই স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে পারে না, যা শেষ পর্যন্ত স্ট্রেস বা বিষণ্ণতা তৈরি করে।
দায় কি শুধু প্রযুক্তির?
এ সংকটের দায় কোনো একক পক্ষের নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সবার। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এমনভাবে তৈরি করে, যেন আপনি ফোনটি রেখে দিতে না পারেন। তাদের কাছে আপনার ‘মনোযোগ’ একটি পণ্য, যা ব্যবহার করে তারা আমাদের মূল্যবান সময় কেড়ে নিচ্ছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য মানহীন কনটেন্ট তৈরি করে তরুণ প্রজন্মকে ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছেন। আর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দায়বদ্ধতাও কম নয়। বিশেষ করে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে নজরদারি না রাখা এবং ডিজিটাল আসক্তিকে গুরুত্ব না দেওয়া সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ। ছোট বয়স থেকে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন দিলে এর প্রভাব খুবই মারাত্মক হতে পারে।
আমাদের করণীয়: ডিজিটাল ডিটক্স
এই অদৃশ্য নেশা থেকে বের হতে হলে প্রয়োজন কঠোর ‘ডিজিটাল হাইজিন’ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে সোশ্যাল মিডিয়া বা রিলস-টিকটক থেকে দূরে থাকতে হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ ও স্ক্রিনের প্রতি অভিভাবকদের সজাগ দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য। অর্থবহ ও উপকারী কনটেন্ট দেখার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং পড়াশোনা, মাঠে খেলাধুলা ও অফলাইন বিনোদনে উৎসাহ প্রদান জরুরি। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটালসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে এই বিষবাষ্প থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব।
রিপোর্টারের নাম 





















