ঢাকা ০৭:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

প্রথম খেলাফতের চ্যালেঞ্জ: ধর্মদ্রোহী দমনে আবু বকরের (রা.) রণনীতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৩৮:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে যখন ধর্মদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলার কালো ছায়া নেমে আসে, তখন দৃঢ়চেতা খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। নবগঠিত খেলাফতকে টিকিয়ে রাখা এবং ইসলামের ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও রণকৌশল ছিল অবিস্মরণীয়। এই অভিযানে তিনি একদিকে যেমন ধর্মদ্রোহী গোত্রগুলোকে ইসলামের পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান, তেমনি প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগেও পিছপা হননি। বিশেষ করে সমরনায়ক খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযান ছিল এই যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি।

নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পর কিছু আরব গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে বা জাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। এই সঙ্কটময় মুহূর্তে খলিফা আবু বকর (রা.) প্রথমে ধর্মদ্রোহী গোত্রগুলোর কাছে শেষবারের মতো চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি তাদের ইসলামের পথে ফিরে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান এবং সতর্ক করেন যে, তাদের আহ্বান মানা না হলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। তিনি স্পষ্ট করে দেন, যারা রাসুল (সা.)-এর আনীত সকল বিধান ও আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা রাখে, তারাই ইসলামের অনুসারী। আর যারা ইসলামের বিধান প্রত্যাখ্যান করে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই অপরিহার্য। তিনি বলেন, নবীজি (সা.) মানুষ ছিলেন এবং ইসলাম পূর্ণাঙ্গতা লাভের পর আল্লাহ তাঁকে দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছেন। যারা ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা.)-এর উপাসক, তাদের জেনে রাখা উচিত যে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা এক আল্লাহর ইবাদত করে, তারা জানে আল্লাহ চিরঞ্জীব। খলিফা ধর্মদ্রোহীদের আল্লাহর ক্ষমা লাভের সুযোগ নেওয়ার এবং শয়তানের প্ররোচনা ত্যাগ করার উপদেশ দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যারা হঠকারী হয়ে ধর্মদ্রোহে লিপ্ত থাকবে, তরবারি তাদের ফায়সালা করবে এবং তাদের মনে রাখা উচিত, আল্লাহ মোটেই দুর্বল নন। এই পত্রকে সর্বশেষ ঘোষণা ও সতর্কবার্তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা সত্যিকার অর্থে ইসলামের বিধান পালন করবে, তাদের অবশ্যই জাকাত দিতে হবে; অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

একই সময়ে খেলাফত রাষ্ট্রের খলিফা আবু বকর (রা.) তাঁর জেনারেলদের উদ্দেশে একটি ফরমানপত্র জারি করেন, যেখানে তাদের কর্তব্য, করণীয়, আদেশ-নিষেধের সীমানা কঠিনভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ফরমানে তিনি জেনারেলদের আল্লাহর ভয় করার এবং ধর্মত্যাগের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে মরণপণ লড়াই করার অঙ্গীকার করান। তবে তার আগে তাদের ইসলামে ফিরে আসার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানোর নির্দেশ দেন। যারা সত্যকে আলিঙ্গন করবে, তাদের উপযুক্ত সম্মান ও কর্তব্য শেখানোর কথা বলেন। আর যারা বিরুদ্ধাচরণ করবে, তাদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করার নির্দেশ দেন। গনিমত ও যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তির এক-পঞ্চমাংশ বাইতুল মালের জন্য রেখে দিয়ে বাকিটা নিজেদের মধ্যে বণ্টনের নিয়ম বেঁধে দেন। তিনি বিশৃঙ্খলা পরিহার করতে এবং তৃতীয় কোনো পক্ষ যেন তাদের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলেন। মুসলমানদের পারস্পরিক আচরণে কোমলতা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার ওপরও তিনি জোর দেন।

এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য খলিফা আবু বকর (রা.) মুসলিম সেনাবাহিনীকে এগারোটি ক্ষুদ্র ইউনিটে বিভক্ত করেন। প্রতিটি ইউনিটের সৈন্য সংখ্যা দু-তিন হাজার থেকে ৫ হাজারের বেশি না হলেও তারা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত, শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত এবং নিজেদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। খলিফা প্রতিটি ইউনিটের জন্য গন্তব্য ও যাত্রাপথ সুনির্দিষ্ট করে দেন। এই ক্ষুদ্র ইউনিটগুলোর মোতায়েন কৌশল ও গতিবিধি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে খলিফার অসাধারণ সামরিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমগ্র আরব উপদ্বীপজুড়ে বাহিনীগুলো এমন সুচারু ও পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, প্রতিটি জনপদে সূক্ষ্মভাবে অনুসন্ধান ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে এমন কোনো গোত্র বা অঞ্চল অবশিষ্ট ছিল না, যেখানে মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতি পৌঁছায়নি। খলিফা প্রতিটি বাহিনীর নেতৃত্বে সমর-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বীরদের নিযুক্ত করেন এবং তাদের স্পষ্ট ও বিস্তারিত নির্দেশনা দেন—কোনো অঞ্চলে বিজয় অর্জনের পর পরবর্তী করণীয় কী হবে এবং এরপর কোন পথে অগ্রসর হতে হবে। কৌশলগত প্রয়োজনে কখনো এসব বাহিনী একত্র হতো, আবার শত্রুর সব ধরনের সুযোগ ও দুর্বল পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ করে দেওয়ার জন্য তারা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ত।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদের (রা.) নেতৃত্বে প্রথম ইউনিট
খলিফা আবু বকর (রা.) যুদ্ধের প্রথম বাহিনীর নেতৃত্বের জন্য প্রাথমিকভাবে জায়েদ বিন খাত্তাবকে মনোনীত করলেও তিনি শাহাদতের প্রত্যাশী হওয়ায় দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর আবু হুজাইফার মুক্তদাস সালিম এবং পরে খোদ আবু হুজাইফাও একই কারণ দেখিয়ে বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে খলিফা খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে (রা.) নেতৃত্ব দেন। খালিদ (রা.) প্রথমে কিছুটা দ্বিধা করলেও খলিফার পীড়াপীড়িতে দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন।

অদম্য ও তীক্ষ্ণবুদ্ধি সমরনায়ক খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) মদিনা থেকে চার হাজার যোদ্ধা সঙ্গে নিয়ে আসাদ গোত্রের অভিমুখে যাত্রা করেন। এগারোটি ইউনিটের মধ্যে এটিই ছিল সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী। তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। প্রথমেই তাঁকে দমন করতে হবে তায়ি গোত্রের বিদ্রোহ। এরপর অপেক্ষা করছিল আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ—তুলাইহা বিন খুয়াইলিদ আসাদির নেতৃত্বাধীন বনু আসাদ গোত্র, যারা সে সময় নিজেদের শক্তি ও প্রভাব বিস্তার করে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। এরপর তাঁর অগ্রযাত্রার লক্ষ্য ছিল বনু তামিম—যেখানে মালিক বিন নুওয়াইরার মতো প্রভাবশালী ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তি অবস্থান করছিল। এ অঞ্চল ছিল রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও সামরিকভাবে সংবেদনশীল। এসব পর্যায় অতিক্রম করে সফল হলে তাঁকে অগ্রসর হতে হতো ইয়ামামার দিকে, বনু হানিফা গোত্রের মোকাবিলায়। সেখানেই অবস্থান করছিল ধর্মত্যাগীদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত বাহিনী—ভণ্ড নবী মুসাইলামার নেতৃত্বে। এই অভিযান শুধু সামরিক অগ্রযাত্রা ছিল না, বরং তা ছিল এক ধারাবাহিক সংকট-ব্যবস্থাপনার কৌশলগত প্রয়াস, যেখানে প্রতিটি ধাপ ছিল পূর্ববর্তী ধাপের চেয়ে অধিক জটিল ও বিপজ্জনক।

তায়ি গোত্রে অভিযান
আদি ইবনে হাতেম তায়ি (রা.) খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর বাহিনীর একজন সৈনিক ছিলেন। নিজ গোত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন সম্মানিত, প্রভাবশালী ও দূরদর্শী নেতা। মুসলিম বাহিনী যখন তায়ি গোত্রের ভূখণ্ড অতিক্রম করছিল, তখন দেখা গেল—গোত্রের অধিকাংশ লোক মুরতাদ হয়ে গেছে। কেবল ‘গাউস’ ও ‘জাদিলা’ নামক দুটি শাখা ইসলামের ওপর অবিচল রয়েছে। পরিস্থিতি অনুধাবন করে খালিদ (রা.) যখন সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত হলেন, তখন আদি ইবনে হাতেম (রা.) বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ জানালেন, “আমাকে একদিন সময় দিন। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলি; হয়তো তারা সত্যের পথে ফিরে আসবে।” তাঁর আবেদন মঞ্জুর করা হলো। আদি (রা.) গোত্রের লোকদের কাছে গিয়ে তাদের উপদেশ দিলেন, সতর্ক করলেন এবং ঈমানের স্মৃতি জাগ্রত করলেন। তাঁর আন্তরিক আহ্বানে ‘গাউস’ শাখা আবার ইসলামের পতাকাতলে প্রত্যাবর্তন করল এবং ৫০০ মুজাহিদ নিয়ে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিল। ফলে বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়াল ৪ হাজার ৫০০। এরপর খালিদ (রা.) অগ্রসর হতে চাইলে আদি (রা.) আবার বললেন, “আপনি কি এক হাত দিয়ে যুদ্ধ করতে চান, নাকি দুই হাত দিয়ে?” খালিদ (রা.) জবাব দিলেন, “অবশ্যই দুই হাত দিয়ে।” আদি (রা.) বললেন, “গাউস ছিল আমার এক হাত; আর জাদিলা হলো আমার অন্য হাত। আমাকে জাদিলার কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিন।” আবার তিনি নিজ গোত্রের আরেক শাখার কাছে গেলেন। তাঁর প্রজ্ঞা, মর্যাদা ও আন্তরিকতার প্রভাবে ‘জাদিলা’ শাখাও ইসলামে ফিরে এলো এবং আরো ৫০০ মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দিল। এভাবে মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৫,০০০-এ উপনীত হলো।

বনু আসাদের সঙ্গে যুদ্ধ
৫,০০০ সৈন্য নিয়ে খালিদ (রা.) বুজাখা অঞ্চলে তুলাইহা আসাদির ৬,০০০ সৈন্যের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হন। সৈন্যসংখ্যার দিক থেকে লড়াইটি প্রায় সমানে-সমান হলেও ঈমানি শক্তির বলে মুসলিমরা তুলাইহার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। তুলাইহা সস্ত্রীক সিরিয়ায় পালিয়ে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করেন। সে ইসলাম গ্রহণ করে পারস্য বিজয়ের অভিযানে অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বনু তামিম গোত্রে
এরপর খালিদ (রা.) বনু তামিম গোত্রের অঞ্চলে পৌঁছালেন। বনু আসাদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই তারা যে দ্রুততায় ইসলাম ত্যাগ করেছিল, ঠিক তেমনি দ্রুততায় আবার ইসলামের ছায়াতলে ফিরে এলো। শক্তির ভারসাম্য ও বাস্তব পরিস্থিতি তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল—এ কথা অনস্বীকার্য। খলিফা আবু বকর (রা.) সেনাপতিদের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছিলেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন—কোনো জনপদে যদি আজান ও ইকামতের ধ্বনি শোনা যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা যাবে না; বরং শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিতে হবে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এরপর তাদের কাছে জাকাত দেওয়ার আহ্বান জানাতে হবে। যদি তারা জাকাত আদায়ে সম্মত হয় এবং ইসলামের বিধান মেনে চলে, তবে তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কিন্তু যদি তারা জাকাত প্রত্যাখ্যান করে এবং বিদ্রোহের অবস্থানে অবিচল থাকে, তবে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও ঐক্য রক্ষার্থে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ নীতিমালা প্রমাণ করে—খেলাফত রাষ্ট্রে সামরিক অভিযান শুধু অরাজক প্রতিশোধ ছিল না; বরং ছিল সুসংহত রাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে ধর্মীয় আনুগত্য, আর্থিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা—সবকিছুকেই সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হতো।

মালিক ইবন নুওয়াইরা প্রসঙ্গ
মুসলিম বাহিনী যখন বনু তামিম গোত্রের নেতা মালিক বিন নুওয়াইরার বসতিতে পৌঁছায়, তখন খালিদ (রা.) মালিক বিন নুওয়াইরাসহ কয়েকজনকে বন্দি করেন। সে রাত ছিল হিম শীতল। বন্দিদের কষ্ট বিবেচনায় নিয়ে তিনি পাহারাদারদের নির্দেশ দেন—‘বন্দিদের উষ্ণ করো।’ কিন্তু আঞ্চলিক উপভাষায় ‘উষ্ণ করা’ কথাটি আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার অর্থেও ব্যবহৃত হতো। এই ভাষাগত বিভ্রান্তির ফলে পাহারাদাররা নির্দেশের ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করে বন্দিদের হত্যা করতে শুরু করে। গোত্রপতি মালিক বিন নুওয়াইরাকে হত্যার মাধ্যমে তারা কার্যত সেই ভুল ব্যাখ্যার বাস্তবায়ন শুরু করে। কয়েকজন নিহত হওয়ার পর যখন বিষয়টি খালিদের কানে পৌঁছে, তিনি তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে তাদের থামিয়ে দেন। সে বাহিনীতে উপস্থিত ছিলেন আবু কাতাদা (রা.)। বন্দিদের হত্যার ঘটনায় তিনি খুব ক্ষুব্ধ হন এবং অনুমতি ছাড়াই সরাসরি মদিনায় গিয়ে খলিফার কাছে অভিযোগ করেন। উমর (রা.) খলিফার সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করলে তিনি শর্ত দেন—আবু কাতাদাহকে আবার খালিদের বাহিনীতে ফিরে যেতে হবে। তিনি ফিরে যান এবং খালিদের সঙ্গেই অবস্থান করেন। পরে আবু বকর (রা.) ঘটনাটি নিয়ে খালিদকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। খালিদ (রা.) ব্যাখ্যা দিলে খলিফা তা গ্রহণ করেন। বনু আসাদ ও বনু তামিম গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে সম্পাদন এবং উভয় ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বিজয় অর্জনের পর খলিফা তাকে আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। এতে প্রমাণ হয়, রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব পুনর্বহাল করা যায়।

দুর্বৃত্তদের দমন
খলিফার নির্দেশে খালিদ (রা.) প্রায় এক মাস বুজাখা অঞ্চলে অবস্থান করেন। এ সময় তিনি আশপাশের দুর্বৃত্ত ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করেন—যারা সুযোগ পেলেই মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালাত, নির্যাতন করত এবং সাধারণ নাগরিকদের জানমাল ক্ষতিগ্রস্ত করত। এই বিদ্রোহীদের মধ্যে অন্যতম ছিল উম্মে জিমল ফাজারিয়্যাহ। নবীজির ইন্তেকালের পর সে ইসলাম ত্যাগ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। একসময় সে গ্রেপ্তার হয়ে দাস হিসেবে আয়েশা (রা.)-এর অংশে পড়েছিল। আয়েশা (রা.) সদাচরণ করে তাকে মুক্ত করে দেয়েছিলেন। কিন্তু সে এই মহানুভবতার মর্যাদা রক্ষা করেনি। পরে যখন সে খালিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসে, তখন মুসলিম বাহিনী তার নির্বাচিত একশ রক্ষীবাহিনীর কঠোর বেষ্টনী ভেদ করে তাকে পরাস্ত ও হত্যা করে। তার মৃত্যুর মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব আরব অঞ্চলে চলমান বিদ্রোহ কার্যত স্তিমিত হয়ে আসে এবং সেখানে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতীয় নির্বাচনে ‘তিন লাভের’ দাবি জামায়াত আমিরের, দ্বিতীয় লড়াই স্থানীয় সরকারে

প্রথম খেলাফতের চ্যালেঞ্জ: ধর্মদ্রোহী দমনে আবু বকরের (রা.) রণনীতি

আপডেট সময় : ০২:৩৮:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে যখন ধর্মদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলার কালো ছায়া নেমে আসে, তখন দৃঢ়চেতা খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। নবগঠিত খেলাফতকে টিকিয়ে রাখা এবং ইসলামের ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও রণকৌশল ছিল অবিস্মরণীয়। এই অভিযানে তিনি একদিকে যেমন ধর্মদ্রোহী গোত্রগুলোকে ইসলামের পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান, তেমনি প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগেও পিছপা হননি। বিশেষ করে সমরনায়ক খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযান ছিল এই যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি।

নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পর কিছু আরব গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে বা জাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। এই সঙ্কটময় মুহূর্তে খলিফা আবু বকর (রা.) প্রথমে ধর্মদ্রোহী গোত্রগুলোর কাছে শেষবারের মতো চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি তাদের ইসলামের পথে ফিরে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান এবং সতর্ক করেন যে, তাদের আহ্বান মানা না হলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। তিনি স্পষ্ট করে দেন, যারা রাসুল (সা.)-এর আনীত সকল বিধান ও আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা রাখে, তারাই ইসলামের অনুসারী। আর যারা ইসলামের বিধান প্রত্যাখ্যান করে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই অপরিহার্য। তিনি বলেন, নবীজি (সা.) মানুষ ছিলেন এবং ইসলাম পূর্ণাঙ্গতা লাভের পর আল্লাহ তাঁকে দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছেন। যারা ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা.)-এর উপাসক, তাদের জেনে রাখা উচিত যে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা এক আল্লাহর ইবাদত করে, তারা জানে আল্লাহ চিরঞ্জীব। খলিফা ধর্মদ্রোহীদের আল্লাহর ক্ষমা লাভের সুযোগ নেওয়ার এবং শয়তানের প্ররোচনা ত্যাগ করার উপদেশ দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যারা হঠকারী হয়ে ধর্মদ্রোহে লিপ্ত থাকবে, তরবারি তাদের ফায়সালা করবে এবং তাদের মনে রাখা উচিত, আল্লাহ মোটেই দুর্বল নন। এই পত্রকে সর্বশেষ ঘোষণা ও সতর্কবার্তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা সত্যিকার অর্থে ইসলামের বিধান পালন করবে, তাদের অবশ্যই জাকাত দিতে হবে; অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

একই সময়ে খেলাফত রাষ্ট্রের খলিফা আবু বকর (রা.) তাঁর জেনারেলদের উদ্দেশে একটি ফরমানপত্র জারি করেন, যেখানে তাদের কর্তব্য, করণীয়, আদেশ-নিষেধের সীমানা কঠিনভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ফরমানে তিনি জেনারেলদের আল্লাহর ভয় করার এবং ধর্মত্যাগের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে মরণপণ লড়াই করার অঙ্গীকার করান। তবে তার আগে তাদের ইসলামে ফিরে আসার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানোর নির্দেশ দেন। যারা সত্যকে আলিঙ্গন করবে, তাদের উপযুক্ত সম্মান ও কর্তব্য শেখানোর কথা বলেন। আর যারা বিরুদ্ধাচরণ করবে, তাদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করার নির্দেশ দেন। গনিমত ও যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তির এক-পঞ্চমাংশ বাইতুল মালের জন্য রেখে দিয়ে বাকিটা নিজেদের মধ্যে বণ্টনের নিয়ম বেঁধে দেন। তিনি বিশৃঙ্খলা পরিহার করতে এবং তৃতীয় কোনো পক্ষ যেন তাদের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলেন। মুসলমানদের পারস্পরিক আচরণে কোমলতা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার ওপরও তিনি জোর দেন।

এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য খলিফা আবু বকর (রা.) মুসলিম সেনাবাহিনীকে এগারোটি ক্ষুদ্র ইউনিটে বিভক্ত করেন। প্রতিটি ইউনিটের সৈন্য সংখ্যা দু-তিন হাজার থেকে ৫ হাজারের বেশি না হলেও তারা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত, শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত এবং নিজেদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। খলিফা প্রতিটি ইউনিটের জন্য গন্তব্য ও যাত্রাপথ সুনির্দিষ্ট করে দেন। এই ক্ষুদ্র ইউনিটগুলোর মোতায়েন কৌশল ও গতিবিধি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে খলিফার অসাধারণ সামরিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমগ্র আরব উপদ্বীপজুড়ে বাহিনীগুলো এমন সুচারু ও পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, প্রতিটি জনপদে সূক্ষ্মভাবে অনুসন্ধান ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে এমন কোনো গোত্র বা অঞ্চল অবশিষ্ট ছিল না, যেখানে মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতি পৌঁছায়নি। খলিফা প্রতিটি বাহিনীর নেতৃত্বে সমর-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বীরদের নিযুক্ত করেন এবং তাদের স্পষ্ট ও বিস্তারিত নির্দেশনা দেন—কোনো অঞ্চলে বিজয় অর্জনের পর পরবর্তী করণীয় কী হবে এবং এরপর কোন পথে অগ্রসর হতে হবে। কৌশলগত প্রয়োজনে কখনো এসব বাহিনী একত্র হতো, আবার শত্রুর সব ধরনের সুযোগ ও দুর্বল পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ করে দেওয়ার জন্য তারা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ত।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদের (রা.) নেতৃত্বে প্রথম ইউনিট
খলিফা আবু বকর (রা.) যুদ্ধের প্রথম বাহিনীর নেতৃত্বের জন্য প্রাথমিকভাবে জায়েদ বিন খাত্তাবকে মনোনীত করলেও তিনি শাহাদতের প্রত্যাশী হওয়ায় দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর আবু হুজাইফার মুক্তদাস সালিম এবং পরে খোদ আবু হুজাইফাও একই কারণ দেখিয়ে বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে খলিফা খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে (রা.) নেতৃত্ব দেন। খালিদ (রা.) প্রথমে কিছুটা দ্বিধা করলেও খলিফার পীড়াপীড়িতে দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন।

অদম্য ও তীক্ষ্ণবুদ্ধি সমরনায়ক খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) মদিনা থেকে চার হাজার যোদ্ধা সঙ্গে নিয়ে আসাদ গোত্রের অভিমুখে যাত্রা করেন। এগারোটি ইউনিটের মধ্যে এটিই ছিল সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী। তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। প্রথমেই তাঁকে দমন করতে হবে তায়ি গোত্রের বিদ্রোহ। এরপর অপেক্ষা করছিল আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ—তুলাইহা বিন খুয়াইলিদ আসাদির নেতৃত্বাধীন বনু আসাদ গোত্র, যারা সে সময় নিজেদের শক্তি ও প্রভাব বিস্তার করে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। এরপর তাঁর অগ্রযাত্রার লক্ষ্য ছিল বনু তামিম—যেখানে মালিক বিন নুওয়াইরার মতো প্রভাবশালী ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তি অবস্থান করছিল। এ অঞ্চল ছিল রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও সামরিকভাবে সংবেদনশীল। এসব পর্যায় অতিক্রম করে সফল হলে তাঁকে অগ্রসর হতে হতো ইয়ামামার দিকে, বনু হানিফা গোত্রের মোকাবিলায়। সেখানেই অবস্থান করছিল ধর্মত্যাগীদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত বাহিনী—ভণ্ড নবী মুসাইলামার নেতৃত্বে। এই অভিযান শুধু সামরিক অগ্রযাত্রা ছিল না, বরং তা ছিল এক ধারাবাহিক সংকট-ব্যবস্থাপনার কৌশলগত প্রয়াস, যেখানে প্রতিটি ধাপ ছিল পূর্ববর্তী ধাপের চেয়ে অধিক জটিল ও বিপজ্জনক।

তায়ি গোত্রে অভিযান
আদি ইবনে হাতেম তায়ি (রা.) খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর বাহিনীর একজন সৈনিক ছিলেন। নিজ গোত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন সম্মানিত, প্রভাবশালী ও দূরদর্শী নেতা। মুসলিম বাহিনী যখন তায়ি গোত্রের ভূখণ্ড অতিক্রম করছিল, তখন দেখা গেল—গোত্রের অধিকাংশ লোক মুরতাদ হয়ে গেছে। কেবল ‘গাউস’ ও ‘জাদিলা’ নামক দুটি শাখা ইসলামের ওপর অবিচল রয়েছে। পরিস্থিতি অনুধাবন করে খালিদ (রা.) যখন সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত হলেন, তখন আদি ইবনে হাতেম (রা.) বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ জানালেন, “আমাকে একদিন সময় দিন। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলি; হয়তো তারা সত্যের পথে ফিরে আসবে।” তাঁর আবেদন মঞ্জুর করা হলো। আদি (রা.) গোত্রের লোকদের কাছে গিয়ে তাদের উপদেশ দিলেন, সতর্ক করলেন এবং ঈমানের স্মৃতি জাগ্রত করলেন। তাঁর আন্তরিক আহ্বানে ‘গাউস’ শাখা আবার ইসলামের পতাকাতলে প্রত্যাবর্তন করল এবং ৫০০ মুজাহিদ নিয়ে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিল। ফলে বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়াল ৪ হাজার ৫০০। এরপর খালিদ (রা.) অগ্রসর হতে চাইলে আদি (রা.) আবার বললেন, “আপনি কি এক হাত দিয়ে যুদ্ধ করতে চান, নাকি দুই হাত দিয়ে?” খালিদ (রা.) জবাব দিলেন, “অবশ্যই দুই হাত দিয়ে।” আদি (রা.) বললেন, “গাউস ছিল আমার এক হাত; আর জাদিলা হলো আমার অন্য হাত। আমাকে জাদিলার কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিন।” আবার তিনি নিজ গোত্রের আরেক শাখার কাছে গেলেন। তাঁর প্রজ্ঞা, মর্যাদা ও আন্তরিকতার প্রভাবে ‘জাদিলা’ শাখাও ইসলামে ফিরে এলো এবং আরো ৫০০ মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দিল। এভাবে মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৫,০০০-এ উপনীত হলো।

বনু আসাদের সঙ্গে যুদ্ধ
৫,০০০ সৈন্য নিয়ে খালিদ (রা.) বুজাখা অঞ্চলে তুলাইহা আসাদির ৬,০০০ সৈন্যের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হন। সৈন্যসংখ্যার দিক থেকে লড়াইটি প্রায় সমানে-সমান হলেও ঈমানি শক্তির বলে মুসলিমরা তুলাইহার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। তুলাইহা সস্ত্রীক সিরিয়ায় পালিয়ে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করেন। সে ইসলাম গ্রহণ করে পারস্য বিজয়ের অভিযানে অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বনু তামিম গোত্রে
এরপর খালিদ (রা.) বনু তামিম গোত্রের অঞ্চলে পৌঁছালেন। বনু আসাদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই তারা যে দ্রুততায় ইসলাম ত্যাগ করেছিল, ঠিক তেমনি দ্রুততায় আবার ইসলামের ছায়াতলে ফিরে এলো। শক্তির ভারসাম্য ও বাস্তব পরিস্থিতি তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল—এ কথা অনস্বীকার্য। খলিফা আবু বকর (রা.) সেনাপতিদের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছিলেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন—কোনো জনপদে যদি আজান ও ইকামতের ধ্বনি শোনা যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা যাবে না; বরং শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিতে হবে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এরপর তাদের কাছে জাকাত দেওয়ার আহ্বান জানাতে হবে। যদি তারা জাকাত আদায়ে সম্মত হয় এবং ইসলামের বিধান মেনে চলে, তবে তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কিন্তু যদি তারা জাকাত প্রত্যাখ্যান করে এবং বিদ্রোহের অবস্থানে অবিচল থাকে, তবে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও ঐক্য রক্ষার্থে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ নীতিমালা প্রমাণ করে—খেলাফত রাষ্ট্রে সামরিক অভিযান শুধু অরাজক প্রতিশোধ ছিল না; বরং ছিল সুসংহত রাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে ধর্মীয় আনুগত্য, আর্থিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা—সবকিছুকেই সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হতো।

মালিক ইবন নুওয়াইরা প্রসঙ্গ
মুসলিম বাহিনী যখন বনু তামিম গোত্রের নেতা মালিক বিন নুওয়াইরার বসতিতে পৌঁছায়, তখন খালিদ (রা.) মালিক বিন নুওয়াইরাসহ কয়েকজনকে বন্দি করেন। সে রাত ছিল হিম শীতল। বন্দিদের কষ্ট বিবেচনায় নিয়ে তিনি পাহারাদারদের নির্দেশ দেন—‘বন্দিদের উষ্ণ করো।’ কিন্তু আঞ্চলিক উপভাষায় ‘উষ্ণ করা’ কথাটি আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার অর্থেও ব্যবহৃত হতো। এই ভাষাগত বিভ্রান্তির ফলে পাহারাদাররা নির্দেশের ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করে বন্দিদের হত্যা করতে শুরু করে। গোত্রপতি মালিক বিন নুওয়াইরাকে হত্যার মাধ্যমে তারা কার্যত সেই ভুল ব্যাখ্যার বাস্তবায়ন শুরু করে। কয়েকজন নিহত হওয়ার পর যখন বিষয়টি খালিদের কানে পৌঁছে, তিনি তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে তাদের থামিয়ে দেন। সে বাহিনীতে উপস্থিত ছিলেন আবু কাতাদা (রা.)। বন্দিদের হত্যার ঘটনায় তিনি খুব ক্ষুব্ধ হন এবং অনুমতি ছাড়াই সরাসরি মদিনায় গিয়ে খলিফার কাছে অভিযোগ করেন। উমর (রা.) খলিফার সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করলে তিনি শর্ত দেন—আবু কাতাদাহকে আবার খালিদের বাহিনীতে ফিরে যেতে হবে। তিনি ফিরে যান এবং খালিদের সঙ্গেই অবস্থান করেন। পরে আবু বকর (রা.) ঘটনাটি নিয়ে খালিদকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। খালিদ (রা.) ব্যাখ্যা দিলে খলিফা তা গ্রহণ করেন। বনু আসাদ ও বনু তামিম গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে সম্পাদন এবং উভয় ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বিজয় অর্জনের পর খলিফা তাকে আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। এতে প্রমাণ হয়, রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব পুনর্বহাল করা যায়।

দুর্বৃত্তদের দমন
খলিফার নির্দেশে খালিদ (রা.) প্রায় এক মাস বুজাখা অঞ্চলে অবস্থান করেন। এ সময় তিনি আশপাশের দুর্বৃত্ত ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করেন—যারা সুযোগ পেলেই মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালাত, নির্যাতন করত এবং সাধারণ নাগরিকদের জানমাল ক্ষতিগ্রস্ত করত। এই বিদ্রোহীদের মধ্যে অন্যতম ছিল উম্মে জিমল ফাজারিয়্যাহ। নবীজির ইন্তেকালের পর সে ইসলাম ত্যাগ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। একসময় সে গ্রেপ্তার হয়ে দাস হিসেবে আয়েশা (রা.)-এর অংশে পড়েছিল। আয়েশা (রা.) সদাচরণ করে তাকে মুক্ত করে দেয়েছিলেন। কিন্তু সে এই মহানুভবতার মর্যাদা রক্ষা করেনি। পরে যখন সে খালিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসে, তখন মুসলিম বাহিনী তার নির্বাচিত একশ রক্ষীবাহিনীর কঠোর বেষ্টনী ভেদ করে তাকে পরাস্ত ও হত্যা করে। তার মৃত্যুর মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব আরব অঞ্চলে চলমান বিদ্রোহ কার্যত স্তিমিত হয়ে আসে এবং সেখানে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।