ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সারাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়গুলো পুনরায় সচল করার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে তালাবদ্ধ কার্যালয় খুলে ভেতরে প্রবেশ করছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়ে ফুলের মালা দিচ্ছেন। কোথাও জাতীয় পতাকার পাশাপাশি দলীয় পতাকা উত্তোলন, ব্যানার টাঙানো এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে মিছিলও করছেন তারা। এই তৎপরতা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এরই মধ্যে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের তৎপরতা চলতে দেওয়া হবে না।
পুলিশের কঠোর হুঁশিয়ারি
গত রোববার পুলিশ সদরদপ্তরে দেশের সকল ইউনিট প্রধান, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল সভায় পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের তৎপরতা বরদাস্ত করা হবে না। তিনি বলেন, কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই নির্দেশনা সারাদেশে পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে থাকার বার্তা দিয়েছে।
দেশজুড়ে কার্যালয় সচলের প্রবণতা
নির্বাচনের পরদিন পঞ্চগড় থেকে এই প্রবণতার সূত্রপাত হয়। জেলার চাকলাহাট ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালা খোলা হয় স্থানীয় এক নেতার উপস্থিতিতে। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে ওই নেতা দাবি করেন, কার্যালয়টি যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের, তা তিনি জানতেন না।
এরপর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডিতে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন কয়েকজন নেতাকর্মী। ২০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, দলটির কয়েকজন নারী কর্মী ধানমন্ডিতে সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে গিয়ে জাতীয় পতাকা টাঙিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন।
গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, ঠাকুরগাঁও, সাতক্ষীরা, বরগুনার বেতাগী, পটুয়াখালীর দশমিনা এবং খুলনায় কার্যালয় খুলে অবস্থান করেন দলটির নেতাকর্মীরা। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, জামালপুর, রাজবাড়ীসহ আরও কয়েকটি জেলায় জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বন্ধ থাকা কার্যালয়গুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দলীয় স্লোগান দিতে দেখা গেছে। তবে রাজধানীসহ দেশের কিছু জেলায় কার্যালয় খোলার পরপরই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কর্মীরা হামলা চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন।
যশোরে ছবি টাঙানোর ঘটনা
যশোরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির দুটি কার্যালয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি টাঙানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি দলটির জেলা কার্যালয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর যশোর শহরের নেতাজী সুভাষচন্দ্র সড়কে জেলা কার্যালয়ের ব্যালকনিতে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা একটি ছোট ব্যানার ঝুলিয়ে দেয়, যেখানে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবি ছিল। খবর পেয়ে পুলিশ ব্যানারটি সরিয়ে নেয়।
অন্যদিকে, ২০ ফেব্রুয়ারি তারাবির নামাজের সময় বাঘারপাড়া উপজেলা কার্যালয়ের তালা ভেঙে ৩০-৩৫ জন যুবক ভেতরে প্রবেশ করে। তারা কার্যালয়টিতে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। স্থানীয়দের মতে, এই যুবকরা বাঘারপাড়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যানের অনুসারী।
কুমিল্লায় ছাত্র-যুব সংগঠনের তৎপরতা ও গ্রেপ্তার
কুমিল্লার বুড়িচংয়ের ব্রাহ্মণপাড়া ও নাঙ্গলকোট উপজেলা কার্যালয়ে গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতারা প্রবেশ করেন। কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। এ সময় তারা কার্যালয় পরিষ্কার করে কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেন।
বুড়িচং থানার ওসি জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কার্যালয় খুলে অবস্থান করার পর অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ব্রাহ্মণপাড়া থানার ওসি জানান, ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় শুক্রবার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করা একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
কুড়িগ্রামে কার্যালয় দখল ও অগ্নিসংযোগ
গত বুধবার সকালে কুড়িগ্রামে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির জেলা কার্যালয়ে ব্যানার ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন জেলা ছাত্র সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালের দিকে শাপলা মোড়স্থ জেলা কার্যালয়ে ৬-৭ জন নেতাকর্মী ব্যানার ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে স্লোগান দেন।
এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বেলা ১২টার দিকে কুড়িগ্রাম জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা ছাত্র সংগঠনের লাগানো জাতীয় পতাকা ও দলীয় ব্যানার অপসারণ করেন। এরপর টিনের প্রাচীর ভেঙে ফেলেন এবং আগুন ধরিয়ে দেন। পুলিশ সুপার জানান, পুলিশের অগোচরে আকস্মিক এই ঘটনা ঘটেছে এবং যারা কার্যালয় চালুর চেষ্টা করেছে তাদের খুঁজে বের করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলনায় কার্যালয় খোলার পর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ
দেড় বছর বন্ধ থাকার পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে খুলনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির কার্যালয়ের তালা খোলেন নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা টাঙান এবং শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবিতে ফুলের মালা দেন। এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাতে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্ররা সেখানে গিয়ে কার্যালয়ের দরজা ভাঙচুর করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। খুলনা সদর থানার ওসি জানান, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
অন্যান্য স্থানে কার্যালয় সচল করার উদ্যোগ
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় দলটির প্রধান কার্যালয় খুলে কেক কাটা হয়েছে। পরে এই ঘটনা ফেসবুকে পোস্ট করা হয়। জানা গেছে, শনিবার দিবাগত রাতে উপজেলা সাধারণ সম্পাদকের ছেলেসহ কয়েকজন মিলে দলীয় কার্যালয়ের প্রধান ফটকের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন এবং কেক কাটেন।
নেত্রকোনার পূর্বধলায় উপজেলা কার্যালয়ের সামনে ‘শুভ উদ্বোধন’ সম্বলিত একটি ব্যানার টাঙিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, গতকাল রোববার সকালে উপজেলা সদরের পূর্বধলা বাজারের দলীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যানারটি দেখা যায়। পূর্বধলা থানার ওসি জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরগুনার বেতাগীতেও দলটির কার্যালয়ের তালা ভেঙে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙানো হয়েছে। এরপর উপজেলার বুড়ামজুমদার ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালাও খোলা হয়।
রিপোর্টারের নাম 

























