জুলাই বিপ্লবের পর ক্ষমতা গ্রহণ করা অন্তর্বর্তী সরকার দেশজুড়ে ৮৭৯টি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম পরিবর্তন করেছে, যেগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে এই ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই নাম পরিবর্তনের তালিকায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা, যার সংখ্যা ২০৫টি। এর পরেই রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, যেখানে ১৮১টি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এছাড়া, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ৮৪টি প্রতিষ্ঠানের নাম বদল করা হয়েছে।
এর আগে গত বছরের ২৬ জুন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল যে, পূর্ববর্তী সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে ৯৭৭টি অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছিল শেখ হাসিনা, তার পরিবার এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের নামে। এর মধ্যে সেনানিবাস, বিমানঘাঁটি, নৌবাহিনীর জাহাজ, মেগাসেতু, সড়ক, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, গবেষণাকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক পরিবর্তিত নামগুলোর তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কলেজ বা মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, একাডেমিক বা বিজ্ঞান ভবন, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেক্সটাইল কলেজ, ছাত্রাবাস বা হোস্টেল, গ্রন্থাগার বা পাঠাগার, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র। এছাড়াও, অন্যান্য স্থাপনার মধ্যে রয়েছে সেনানিবাস, নৌজাহাজ, থানা ও পুলিশের স্থাপনা, পদক/বৃত্তি/ট্রফি, স্যাটেলাইট ও ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, জাদুঘর, কমপ্লেক্স, স্কয়ার, অডিটোরিয়াম, সম্মেলন কেন্দ্র ও নভোথিয়েটার, সড়ক, মহাসড়ক, সরণি, সেতু, টানেল, ফ্লাইওভার, রেলওয়ে স্টেশন, উন্নয়ন প্রকল্প, আর্থিক স্কিম ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পার্ক, ফ্লিম সিটি, উদ্যান, পুনর্বাসন কেন্দ্র, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি স্থাপনা, স্টেডিয়াম ক্রীড়া কমপ্লেক্স, ম্যুরাল, কর্নার, মঞ্চ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি শোধনাগার, চর, বাজার, গ্রাম, বাস টার্মিনালসহ মোট ২৯ ধরনের প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন
শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণ করা বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: নেত্রকোনার শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় এখন নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় এখন কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, নওগাঁর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় এখন নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়, মেহেরপুরের মুজিবনগর বিশ্ববিদ্যালয় এখন মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এখন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এখন শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি এখন ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, জামালপুরের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এখন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পিরোজপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এখন পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নারায়ণগঞ্জের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এখন নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এখন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি এখন বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় এখন অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শেখ হাসিনা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এখন ডা. মমতাজ বেগম ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং জামালপুরের মেলান্দহের শেখ ফজিলাতুনন্নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি এখন ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে। এছাড়া, খুলনার শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেটের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও পরিবর্তন করে যথাক্রমে খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণ করা হয়েছে। শেখ পরিবারের নামে থাকা ৩৪টি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নামও এই পরিবর্তনের আওতায় এসেছে।
একাডেমিক বা বিজ্ঞান ভবনের নাম পরিবর্তন
ঢাকা কলেজের শেখ জামাল একাডেমিক ভবনের নাম পরিবর্তন করে ‘জুলাই ৩৬ একাডেমিক ভবন’ করা হয়েছে। শরীয়তপুর সরকারি কলেজের শেখ লুৎফর রহমান একাডেমিক ভবনের নতুন নাম ‘ডা. গোলাম মাওলা একাডেমিক ভবন’। সরকারি তিতুমীর কলেজের ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান ভবনের পরিবর্তে ‘নতুন বিজ্ঞান ভবন’ এবং শেখ কামাল প্রশাসনিক ভবনের পরিবর্তে শুধু ‘প্রশাসনিক ভবন’ রাখা হয়েছে।
স্টেডিয়াম বা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের নাম পরিবর্তন
শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণ করা ২০৫টি স্টেডিয়াম বা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের নাম পরিবর্তন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে জাতীয় স্টেডিয়াম ঢাকার নাম, যা পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম’ করা হয়েছিল, তা পরিবর্তন করে পুনরায় ‘জাতীয় স্টেডিয়াম ঢাকা’ করা হয়েছে। এছাড়া, রমনা ঢাকার শেখ জামাল জাতীয় টেনিস কমপ্লেক্সের নাম পরিবর্তন করে ‘জাতীয় টেনিস কমপ্লেক্স, রমনা ঢাকা’ এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পল্টন ঢাকার প্রধান ভবনে অবস্থিত শেখ কামাল মিলনায়তনের নাম পরিবর্তন করে ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পল্টন ঢাকা’ করা হয়েছে।
এইসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণ করা ৫৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৯টি উচ্চ বিদ্যালয়, ২৮টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ৯৯টি কলেজ/মহাবিদ্যালয়, ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়, ১২টি একাডেমিক বা বিজ্ঞান ভবন, ৩৪টি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ১৩টি ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেক্সটাইল কলেজ, ৩৫টি ছাত্রাবাস ও হোস্টেল, ১৫টি গ্রন্থাগার ও পাঠাগার, ১৪টি প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র, ৯টি সেনানিবাস, ১১টি নৌজাহাজ, চারটি থানা ও পুলিশের স্থাপনা, ছয়টি পদক, বৃত্তি ও ট্রফি এবং তিনটি স্যাটেলাইট ও ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























