ঢাকা ১১:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অরক্ষিত নজরখালি বাঁধ: টাঙ্গুয়ার হাওরে ৯ হাজার হেক্টর বোরো ধান ডুবির শঙ্কা, শঙ্কিত কৃষক

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১১:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালি বাঁধ অরক্ষিত থাকায় প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল অকাল বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন শত শত প্রান্তিক কৃষক। প্রতি বছর স্থানীয় উদ্যোগে বাঁধটি সংস্কার করা হলেও এ বছর কোনো বরাদ্দ না পাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে হাওরপাড়ের ৮২ গ্রামের বাসিন্দাদের। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই জলাভূমির ফসল রক্ষা বাঁধ সরকারিভাবে উপেক্ষিত থাকায় দুই উপজেলার কৃষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।

তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ ৮২টি গ্রামের কৃষকদের জীবন-জীবিকা এই বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। টাঙ্গুয়ার হাওরের চারপাশে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে যুগ যুগ ধরে বোরো আবাদ করে আসছেন তারা। কিন্তু প্রতি বছরই বর্ষার শুরুতে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার আশঙ্কায় তাদের বুক কাঁপে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, টাঙ্গুয়ার হাওরকে জলাভূমি আখ্যা দিয়ে সরকারিভাবে এর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ প্রতি বছরই উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে থোক বরাদ্দ নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমে উত্তর বংশীকুণ্ডা, দক্ষিণ বংশীকুণ্ডা ও শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের কৃষকরা সম্মিলিতভাবে বাঁধটি সংস্কার করতেন। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বরাদ্দ না আসায় বাঁধটির সংস্কার কাজ থমকে আছে। ফলে আগাম বন্যার সামান্য পানি বাড়লেই হাওরের ফলন্ত ধান তলিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) চলতি অর্থবছরে তাহিরপুর উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ৮৮টি প্রকল্পে ১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও, অনুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় নজরখালি বাঁধের নাম নেই। এতে চার ইউনিয়নের হাজার হাজার কৃষক হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এই বাঁধটি অরক্ষিত থাকলে গনিয়াকুরি, এরালিয়াকুনা, নান্দিয়া, রাঙামাটিয়া, ফলিয়ার বিল, সামসাগর, রুপাভূই, লামারবিল, সোনাডুবি, করছরি, লুঙ্গাতুঙ্গা, শালদিগা, হানিয়া কলমা, মুক্তারখলাসহ হাওরের অন্তত ১৫টি বিল ও সংলগ্ন এলাকার সব বোরো ধান অকাল বন্যায় তলিয়ে যাবে।

মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের রংচি গ্রামের কৃষক বাতেন মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “নজরখালি বাঁধ না দিলে আগাম বন্যায় হাওরের বোরো ফসল ডুবে যাবে, এতে আমরা খাদ্য সংকটে পড়বো। জেলা প্রশাসন তিন বছর ধরে টাঙ্গুয়ার হাওরকে জলাভূমি বলে বাঁধের কাজ করাচ্ছেন না।” একই সুরে কথা বলেন তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের ইন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক উত্তম কুমার বর্মণ। তিনি বলেন, “প্রশাসন প্রতি বছর বরাদ্দ দিতো, এ বছর কেন দিচ্ছে না, তা বুঝতে পারছি না।”

শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলী হায়দার বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি হলেও এখানকার বাসিন্দারা শত শত বছর ধরে বোরো ফসল আবাদ করছেন। প্রতি বছর প্রশাসনের পক্ষ থেকে থোক বরাদ্দ দিয়ে এই বাঁধটি দেওয়া হয়। বাঁধটি না হলে সামান্য বৃষ্টিতেই নদীতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওর তলিয়ে যাবে।”

এ বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালি বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তাকে কেউ জানায়নি। বিষয়টি তাকে জানালে তিনি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন।

এমন পরিস্থিতিতে সময় মতো বাঁধ সংস্কার না হলে কৃষকদের সারা বছরের পরিশ্রম ও স্বপ্ন এক নিমিষেই বিলীন হয়ে যাবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রতি শান্তি আলোচনার প্রস্তাব

অরক্ষিত নজরখালি বাঁধ: টাঙ্গুয়ার হাওরে ৯ হাজার হেক্টর বোরো ধান ডুবির শঙ্কা, শঙ্কিত কৃষক

আপডেট সময় : ১০:১১:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালি বাঁধ অরক্ষিত থাকায় প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল অকাল বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন শত শত প্রান্তিক কৃষক। প্রতি বছর স্থানীয় উদ্যোগে বাঁধটি সংস্কার করা হলেও এ বছর কোনো বরাদ্দ না পাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে হাওরপাড়ের ৮২ গ্রামের বাসিন্দাদের। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই জলাভূমির ফসল রক্ষা বাঁধ সরকারিভাবে উপেক্ষিত থাকায় দুই উপজেলার কৃষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।

তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ ৮২টি গ্রামের কৃষকদের জীবন-জীবিকা এই বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। টাঙ্গুয়ার হাওরের চারপাশে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে যুগ যুগ ধরে বোরো আবাদ করে আসছেন তারা। কিন্তু প্রতি বছরই বর্ষার শুরুতে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার আশঙ্কায় তাদের বুক কাঁপে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, টাঙ্গুয়ার হাওরকে জলাভূমি আখ্যা দিয়ে সরকারিভাবে এর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ প্রতি বছরই উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে থোক বরাদ্দ নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমে উত্তর বংশীকুণ্ডা, দক্ষিণ বংশীকুণ্ডা ও শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের কৃষকরা সম্মিলিতভাবে বাঁধটি সংস্কার করতেন। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বরাদ্দ না আসায় বাঁধটির সংস্কার কাজ থমকে আছে। ফলে আগাম বন্যার সামান্য পানি বাড়লেই হাওরের ফলন্ত ধান তলিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) চলতি অর্থবছরে তাহিরপুর উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ৮৮টি প্রকল্পে ১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও, অনুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় নজরখালি বাঁধের নাম নেই। এতে চার ইউনিয়নের হাজার হাজার কৃষক হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এই বাঁধটি অরক্ষিত থাকলে গনিয়াকুরি, এরালিয়াকুনা, নান্দিয়া, রাঙামাটিয়া, ফলিয়ার বিল, সামসাগর, রুপাভূই, লামারবিল, সোনাডুবি, করছরি, লুঙ্গাতুঙ্গা, শালদিগা, হানিয়া কলমা, মুক্তারখলাসহ হাওরের অন্তত ১৫টি বিল ও সংলগ্ন এলাকার সব বোরো ধান অকাল বন্যায় তলিয়ে যাবে।

মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের রংচি গ্রামের কৃষক বাতেন মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “নজরখালি বাঁধ না দিলে আগাম বন্যায় হাওরের বোরো ফসল ডুবে যাবে, এতে আমরা খাদ্য সংকটে পড়বো। জেলা প্রশাসন তিন বছর ধরে টাঙ্গুয়ার হাওরকে জলাভূমি বলে বাঁধের কাজ করাচ্ছেন না।” একই সুরে কথা বলেন তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের ইন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক উত্তম কুমার বর্মণ। তিনি বলেন, “প্রশাসন প্রতি বছর বরাদ্দ দিতো, এ বছর কেন দিচ্ছে না, তা বুঝতে পারছি না।”

শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলী হায়দার বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি হলেও এখানকার বাসিন্দারা শত শত বছর ধরে বোরো ফসল আবাদ করছেন। প্রতি বছর প্রশাসনের পক্ষ থেকে থোক বরাদ্দ দিয়ে এই বাঁধটি দেওয়া হয়। বাঁধটি না হলে সামান্য বৃষ্টিতেই নদীতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওর তলিয়ে যাবে।”

এ বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালি বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তাকে কেউ জানায়নি। বিষয়টি তাকে জানালে তিনি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন।

এমন পরিস্থিতিতে সময় মতো বাঁধ সংস্কার না হলে কৃষকদের সারা বছরের পরিশ্রম ও স্বপ্ন এক নিমিষেই বিলীন হয়ে যাবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।