ঢাকা ১২:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজনীতিতে ‘ইনকিলাব’ ও ‘আজাদি’র নতুন ব্যবহার: বিতর্ক বনাম ভাষাতত্ত্ব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৪৬:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সংবাদ মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘বয়ান’ ও ‘বন্দোবস্ত’-এর মতো কিছু শব্দের প্রয়োগ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এই শব্দগুলো আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসলেও, এ নিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ এসব শব্দের ব্যবহারকে আন্দোলনের নতুন ভাষা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ একে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহে কৃত্রিম হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করছেন।

বিতর্কটি এখন আর কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পৌঁছে গেছে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যেও। সম্প্রতি একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন যে, এসব শব্দের সঙ্গে বাংলা ভাষার কোনো যোগসূত্র নেই। এমন পরিস্থিতিতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—এই শব্দগুলো কি ভাষার বিকৃতি ঘটাচ্ছে, নাকি এগুলো বাংলা ভাষারই অংশ? কেনই বা হঠাৎ করে এই শব্দগুলো এতোটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল?

ভাষাবিদদের মতে, এই শব্দগুলো বাংলা ভাষার জন্য কোনো নতুন আপদ বা হুমকি নয়। তারা বলছেন, বাংলা ভাষা ঐতিহাসিকভাবেই একটি ‘মিশ্র ভাষা’ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ সময় ধরে ইংরেজি, আরবি ও ফারসি ভাষার অসংখ্য শব্দ বাংলার নিজস্ব ভাণ্ডারে মিশে গেছে। অতীতে ‘আওয়ামী লীগ’, ‘কমিউনিস্ট’ বা ‘ইউনিয়ন’-এর মতো বিদেশি শব্দ যেমন রাজনীতিতে স্থান করে নিয়েছে, তেমনি ‘ইত্তেফাক’ বা ‘ইনকিলাব’-এর মতো শব্দ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় দৈনিক।

বর্তমান বিতর্কের মূলে রয়েছে ২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারী ছাত্রনেতা এবং নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মুখে ‘আজাদি’, ‘নয়া বন্দোবস্ত’, ‘ইনসাফ’ ও ‘মজলুম’-এর মতো শব্দগুলো ঘনঘন শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক একটি প্ল্যাটফর্ম এবং নতুন গঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর সভায় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও এই স্লোগানটির ঐতিহাসিক ব্যবহার ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত।

তবে এই শব্দগুলোর ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিভক্তি স্পষ্ট। বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা সম্প্রতি এক সভায় বলেন, “বাংলাকে ধারণ করতে হলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। এগুলো আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চাওয়াদের ভাষা।” অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা এসব শব্দকে বিপ্লব ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছেন। সাবেক তথ্য উপদেষ্টাও মনে করেন, ভাষা কোনো বদ্ধ কুঠুরি নয়; রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য যখন যে শব্দ মানানসই হবে, সেটিই মানুষ গ্রহণ করবে।

সমালোচকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বাংলাদেশে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিই বহুল প্রচলিত, যাকে এখন ‘আজাদি’ বলা হচ্ছে। একইভাবে ‘বিপ্লব’-এর বদলে ‘ইনকিলাব’, ‘সুবিচার’-এর বদলে ‘ইনসাফ’ কিংবা ‘নিপীড়িত’-এর বদলে ‘মজলুম’ শব্দের অতি-ব্যবহার সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই বিতর্ক প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, “এই শব্দগুলো কোনোভাবেই ভাষার বিকৃতি নয়। তবে এগুলোর ব্যবহার যদি কেবল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তা বিভাজন তৈরি করতে পারে।” তার মতে, ডিজিটাল যুগে কোনো শব্দকে সচেতনভাবে আটকে রাখা সম্ভব নয়; ভাষা তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ কাহালির মতে, ভাষা নদীর মতো প্রবহমান এবং এটি সময়ের প্রয়োজনে অনেক কিছু গ্রহণ ও বর্জন করে। তিনি মনে করেন, বাংলা ভাষার ইতিহাস লড়াইয়ের ইতিহাস এবং এর অস্তিত্ব অত্যন্ত শক্তিশালী। কোনো শব্দ চাপিয়ে দিয়ে যেমন ভাষা পরিবর্তন করা যায় না, তেমনি কোনো শব্দকে জোর করে বাদ দেওয়াও কঠিন। শেষ পর্যন্ত সময় এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহারই ঠিক করে দেবে কোন শব্দগুলো টিকে থাকবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

রাজনীতিতে ‘ইনকিলাব’ ও ‘আজাদি’র নতুন ব্যবহার: বিতর্ক বনাম ভাষাতত্ত্ব

আপডেট সময় : ০৭:৪৬:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সংবাদ মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘বয়ান’ ও ‘বন্দোবস্ত’-এর মতো কিছু শব্দের প্রয়োগ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এই শব্দগুলো আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসলেও, এ নিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ এসব শব্দের ব্যবহারকে আন্দোলনের নতুন ভাষা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ একে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহে কৃত্রিম হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করছেন।

বিতর্কটি এখন আর কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পৌঁছে গেছে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যেও। সম্প্রতি একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন যে, এসব শব্দের সঙ্গে বাংলা ভাষার কোনো যোগসূত্র নেই। এমন পরিস্থিতিতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—এই শব্দগুলো কি ভাষার বিকৃতি ঘটাচ্ছে, নাকি এগুলো বাংলা ভাষারই অংশ? কেনই বা হঠাৎ করে এই শব্দগুলো এতোটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল?

ভাষাবিদদের মতে, এই শব্দগুলো বাংলা ভাষার জন্য কোনো নতুন আপদ বা হুমকি নয়। তারা বলছেন, বাংলা ভাষা ঐতিহাসিকভাবেই একটি ‘মিশ্র ভাষা’ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ সময় ধরে ইংরেজি, আরবি ও ফারসি ভাষার অসংখ্য শব্দ বাংলার নিজস্ব ভাণ্ডারে মিশে গেছে। অতীতে ‘আওয়ামী লীগ’, ‘কমিউনিস্ট’ বা ‘ইউনিয়ন’-এর মতো বিদেশি শব্দ যেমন রাজনীতিতে স্থান করে নিয়েছে, তেমনি ‘ইত্তেফাক’ বা ‘ইনকিলাব’-এর মতো শব্দ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় দৈনিক।

বর্তমান বিতর্কের মূলে রয়েছে ২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারী ছাত্রনেতা এবং নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মুখে ‘আজাদি’, ‘নয়া বন্দোবস্ত’, ‘ইনসাফ’ ও ‘মজলুম’-এর মতো শব্দগুলো ঘনঘন শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক একটি প্ল্যাটফর্ম এবং নতুন গঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর সভায় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও এই স্লোগানটির ঐতিহাসিক ব্যবহার ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত।

তবে এই শব্দগুলোর ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিভক্তি স্পষ্ট। বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা সম্প্রতি এক সভায় বলেন, “বাংলাকে ধারণ করতে হলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। এগুলো আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চাওয়াদের ভাষা।” অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা এসব শব্দকে বিপ্লব ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছেন। সাবেক তথ্য উপদেষ্টাও মনে করেন, ভাষা কোনো বদ্ধ কুঠুরি নয়; রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য যখন যে শব্দ মানানসই হবে, সেটিই মানুষ গ্রহণ করবে।

সমালোচকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বাংলাদেশে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিই বহুল প্রচলিত, যাকে এখন ‘আজাদি’ বলা হচ্ছে। একইভাবে ‘বিপ্লব’-এর বদলে ‘ইনকিলাব’, ‘সুবিচার’-এর বদলে ‘ইনসাফ’ কিংবা ‘নিপীড়িত’-এর বদলে ‘মজলুম’ শব্দের অতি-ব্যবহার সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই বিতর্ক প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, “এই শব্দগুলো কোনোভাবেই ভাষার বিকৃতি নয়। তবে এগুলোর ব্যবহার যদি কেবল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তা বিভাজন তৈরি করতে পারে।” তার মতে, ডিজিটাল যুগে কোনো শব্দকে সচেতনভাবে আটকে রাখা সম্ভব নয়; ভাষা তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ কাহালির মতে, ভাষা নদীর মতো প্রবহমান এবং এটি সময়ের প্রয়োজনে অনেক কিছু গ্রহণ ও বর্জন করে। তিনি মনে করেন, বাংলা ভাষার ইতিহাস লড়াইয়ের ইতিহাস এবং এর অস্তিত্ব অত্যন্ত শক্তিশালী। কোনো শব্দ চাপিয়ে দিয়ে যেমন ভাষা পরিবর্তন করা যায় না, তেমনি কোনো শব্দকে জোর করে বাদ দেওয়াও কঠিন। শেষ পর্যন্ত সময় এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহারই ঠিক করে দেবে কোন শব্দগুলো টিকে থাকবে।