গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘস্থায়ী ও স্বৈরাচারী শাসনের পতনের প্রায় দুই বছর পর এক ঐতিহাসিক নির্বাচনের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। এক সময়ের অস্থিরতা কাটিয়ে ব্যালট পেপারে নিজেদের রায় জানিয়েছে দেশের মানুষ। এই নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিজয়ী হয়ে দেশের হাল ধরেছেন তারেক রহমান। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে একটি ভূমিধস বিজয়ের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যখন দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে আমূল পরিবর্তনের দাবি সর্বমহলে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পতন ঘটেছিল বিগত সরকারের। সেই রক্তক্ষয়ী অধ্যায় পেরিয়ে এই নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করছেন এবং দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনুপস্থিতিতেই তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। তবে তাকে হস্তান্তরে ভারতের অস্বীকৃতি দুই দেশের বর্তমান নাজুক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনি ফলাফল কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং বিগত দেড় দশকের ‘একমুখী’ পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জনমত।
বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ব্যাপকভাবে নয়াদিল্লির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বলা হলেও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং বিরোধী দমনের অভিযোগ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। বিশেষ করে ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রদান করা হলেও, তিস্তার পানি বণ্টন কিংবা সীমান্ত হত্যার মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকটের কোনো সমাধান ঢাকা আদায় করতে পারেনি। এই কূটনৈতিক ভারসাম্যহীনতা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে, যা এখন নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ক্ষমতায় আসার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তার এই অবস্থানের প্রতিফলন ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে আঞ্চলিক কূটনীতিতে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। করাচির সঙ্গে সরাসরি আকাশপথ চালু হওয়া এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়া সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়। তবে এই পরিবর্তনকে কেবল এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির দিকে যাত্রার শুরু।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজপথে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতবিরোধী মনোভাব প্রবল থাকলেও বাস্তবধর্মী রাজনীতির গুরুত্বও অনস্বীকার্য। বাণিজ্য, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা সম্ভব নয়। ফলে নতুন নেতৃত্বের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা—কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রেখে একটি সমমর্যাদার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা যায়।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এখন আর কোনো একক শক্তির ‘প্রভাববলয়’ হিসেবে থাকতে রাজি নয়। চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও নিবিড় করার মাধ্যমে ঢাকা এখন একটি বহুমুখী ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করতে প্রস্তুত। সামনের দিনগুলোতে প্রতিটি কূটনৈতিক করমর্দন এবং চুক্তিই বলে দেবে—বাংলাদেশ আর কোনো বিদেশি শক্তির প্রেসক্রিপশনে নয়, বরং নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই পরিচালিত হতে বদ্ধপরিকর।
রিপোর্টারের নাম 



















