ঢাকা ০৭:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

নাব্য সংকটে ধুঁকছে শুমেশ্বরী: অস্তিত্বের সংকটে মধ্যনগরের শতবর্ষী বাণিজ্যিক ঐতিহ্য

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৩:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা একসময়ের প্রমত্তা শুমেশ্বরী নদী এখন নাব্য হারিয়ে মৃতপ্রায়। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় জেগে উঠেছে বিশাল সব চর। এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মধ্যনগর বাজার। এককালে দেশের অন্যতম বৃহৎ ধানের আড়ত হিসেবে পরিচিত এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রটি এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছে।

ঐতিহাসিকভাবেই মধ্যনগর বাজারের সমৃদ্ধি গড়ে উঠেছিল শুমেশ্বরী নদীকে কেন্দ্র করে। সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনার কলমাকান্দা ছাড়াও মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, ভৈরব ও আশুগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহরের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল এই নদীপথ। বিশেষ করে কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে নদীটি ছিল লাইফলাইন। তবে হেমন্তের শুরুতেই নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে নৌ-চলাচল। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে বাজারের চিরচেনা বাণিজ্যিক ব্যস্ততা।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানি কমে তলদেশ ভেসে ওঠায় বড় নৌকা বা কার্গো চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, আগে এক নৌকায় এক হাজার মণের বেশি ধান সরাসরি আড়তে পৌঁছানো যেত। এখন নদীর নাব্য সংকটে মাঝপথে পণ্য খালাস করে ছোট নৌকায় করে কয়েক দফায় পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হয়েছে, অন্যদিকে বারবার পণ্য ওঠানামার ফলে নষ্ট হচ্ছে গুণগত মান। বাড়তি খরচের এই বোঝা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

নদীর এই করুণ অবস্থার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কৃষিতেও। সেচ কাজের জন্য এখন কৃষকদের সম্পূর্ণভাবে গভীর নলকূপ বা সাবমার্সিবল পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এছাড়া নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগাম বন্যার ঝুঁকিও বাড়ছে। নদীর অনেক জায়গায় জেগে ওঠা চরে স্থানীয়দের গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ধান রোপণ করতে দেখা গেছে, যা একসময় কল্পনাতীত ছিল।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতাদের মতে, শুমেশ্বরী নদীই ছিল মধ্যনগর বাজারের প্রাণ। সহজে ও স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহনের সুবিধা থাকায় দূর-দূরান্তের পাইকাররা এখানে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে যাতায়াত দুর্ভোগের কারণে পাইকাররা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। নদীটি দ্রুত খনন করা না হলে কয়েক বছরের মধ্যে এই অঞ্চলের নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, শুমেশ্বরী ও গুমাই নদী খনন করে কংস নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারলে এই হাওর অঞ্চলের কৃষি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মধ্যনগর বাজার তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলার ১৯টি নদী খননের একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি নদীকে সমন্বিত ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে, যেখানে শুমেশ্বরী নদীর নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে; প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও অনুমোদন মিললেই দ্রুত খনন কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশিষ্ট রত্ন হুরুন নাহার রশীদের জীবনাবসান, শোকস্তব্ধ আমার দেশ পরিবার

নাব্য সংকটে ধুঁকছে শুমেশ্বরী: অস্তিত্বের সংকটে মধ্যনগরের শতবর্ষী বাণিজ্যিক ঐতিহ্য

আপডেট সময় : ০৯:২৩:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা একসময়ের প্রমত্তা শুমেশ্বরী নদী এখন নাব্য হারিয়ে মৃতপ্রায়। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় জেগে উঠেছে বিশাল সব চর। এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মধ্যনগর বাজার। এককালে দেশের অন্যতম বৃহৎ ধানের আড়ত হিসেবে পরিচিত এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রটি এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছে।

ঐতিহাসিকভাবেই মধ্যনগর বাজারের সমৃদ্ধি গড়ে উঠেছিল শুমেশ্বরী নদীকে কেন্দ্র করে। সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনার কলমাকান্দা ছাড়াও মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, ভৈরব ও আশুগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহরের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল এই নদীপথ। বিশেষ করে কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে নদীটি ছিল লাইফলাইন। তবে হেমন্তের শুরুতেই নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে নৌ-চলাচল। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে বাজারের চিরচেনা বাণিজ্যিক ব্যস্ততা।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানি কমে তলদেশ ভেসে ওঠায় বড় নৌকা বা কার্গো চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, আগে এক নৌকায় এক হাজার মণের বেশি ধান সরাসরি আড়তে পৌঁছানো যেত। এখন নদীর নাব্য সংকটে মাঝপথে পণ্য খালাস করে ছোট নৌকায় করে কয়েক দফায় পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হয়েছে, অন্যদিকে বারবার পণ্য ওঠানামার ফলে নষ্ট হচ্ছে গুণগত মান। বাড়তি খরচের এই বোঝা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

নদীর এই করুণ অবস্থার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কৃষিতেও। সেচ কাজের জন্য এখন কৃষকদের সম্পূর্ণভাবে গভীর নলকূপ বা সাবমার্সিবল পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এছাড়া নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগাম বন্যার ঝুঁকিও বাড়ছে। নদীর অনেক জায়গায় জেগে ওঠা চরে স্থানীয়দের গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ধান রোপণ করতে দেখা গেছে, যা একসময় কল্পনাতীত ছিল।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতাদের মতে, শুমেশ্বরী নদীই ছিল মধ্যনগর বাজারের প্রাণ। সহজে ও স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহনের সুবিধা থাকায় দূর-দূরান্তের পাইকাররা এখানে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে যাতায়াত দুর্ভোগের কারণে পাইকাররা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। নদীটি দ্রুত খনন করা না হলে কয়েক বছরের মধ্যে এই অঞ্চলের নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, শুমেশ্বরী ও গুমাই নদী খনন করে কংস নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারলে এই হাওর অঞ্চলের কৃষি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মধ্যনগর বাজার তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলার ১৯টি নদী খননের একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি নদীকে সমন্বিত ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে, যেখানে শুমেশ্বরী নদীর নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে; প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও অনুমোদন মিললেই দ্রুত খনন কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।