ঢাকা ০১:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

কুবিতে হল দখল ঘিরে ছাত্রদলের কোন্দল, নেতার ঘুষিতে কর্মীর নাক ফাটল, আহত ৩

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:০৮:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) আবাসিক হলে সিট দখল ও বহিরাগতদের অবৈধভাবে ওঠানোকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় অন্তত তিনজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, যার মধ্যে এক ছাত্রদল কর্মীর নাক ফেটে গেছে। গুরুতর আহত ওই কর্মীকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হল দখলের চেষ্টার সময় শাখা ছাত্রদলের এক যুগ্ম-আহ্বায়কসহ কয়েকজন নেতা-কর্মী নিজ দলের এক কর্মীর ওপর হামলা চালিয়ে তার নাক ফাটিয়ে দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের তৃতীয় তলার ছাদে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ঘটনার পরপরই হলে অবস্থানরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং হল প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

আহতরা হলেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের মাজহারুল ইসলাম আবির, অর্থনীতি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের তোফায়েল আহমেদ নিবিড় এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এআইএস) বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সৌরভ কাব্য। এদের মধ্যে সৌরভ কাব্যের নাকের হাড় ভেঙে গেছে বলে তার বন্ধুরা জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী এই তিন শিক্ষার্থীও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

অভিযুক্তরা হলেন কুবি শাখা ছাত্রদলের ৪ নম্বর যুগ্ম-আহ্বায়ক ও ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান, যুগ্ম-আহ্বায়ক ও একই শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের তরিকুল এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সিফাত।

আবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অভিযুক্ত আতিকুর রহমান হল কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে দত্ত হলের ৫০০২ নম্বর কক্ষে অবস্থান নেন এবং সেখানে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এক কর্মীকে তোলেন। একইভাবে ২০৪ নম্বর কক্ষে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রদল কর্মী সিফাতকে নিয়মবহির্ভূতভাবে রাখার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের (১৮তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীরা এতে আপত্তি জানান এবং হলের সিনিয়রদের অবহিত করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আতিকুর রহমান কয়েকজন অনাবাসিক শিক্ষার্থী ও কর্মীকে নিয়ে হলের বিভিন্ন কক্ষে যান এবং তাদের বিভিন্ন সিটে থাকার নির্দেশ দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মৌখিক বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়, যা রাতের দিকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানাতে গেলে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সদস্য সচিব মুস্তাফিজুর রহমান শুভর উপস্থিতিতেই আতিকুর রহমান তোফায়েল আহমেদ নিবিড়ের কলার ধরে চড় মারেন। এ সময় বাধা দিতে গেলে আবিরকে ধাক্কা দেওয়া হয় এবং সৌরভ কাব্যকে নাকে ঘুষি মারা হয়, এতে তার নাক ফেটে রক্তপাত শুরু হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হলের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা ছুটে এলে অভিযুক্তরা হল এলাকা থেকে পালিয়ে যান।

ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা হল প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং হল প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তোলেন। আবাসিক শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রদলের কিছু নেতা-কর্মী রাজনৈতিক পরিচয়ে অছাত্রদের হলের কক্ষে তোলার চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর একটি পক্ষ হল দখল ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজয় চব্বিশ হলসহ আরও কয়েকটি হলে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

আহত তোফায়েল আহমেদ নিবিড় বলেন, “আমরা ছাদে ছিলাম। এর মধ্যে ছাত্রদলের আতিক এসে আমার কলার ধরে চড় মারে। ১৭ ব্যাচের একজনের নাকে ঘুষি মেরে রক্ত বের করে দেয়। তাদের সঙ্গে সাইফুল, তরিক ও ১৮ ব্যাচের সিফাত নামের এক শিক্ষার্থী ছিল। তখন সৌরভের নাক ফেটে যায়। আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে আমার হাত মচকে যায়। আতিক আমার বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। সে আমাকে রাজনৈতিকভাবে মারধর করেছে।”

বহিরাগত হয়েও ছাত্রদলের প্রভাব খাটিয়ে হল দখলের চেষ্টা ও শিক্ষার্থীদের মারধরের বিষয়ে অভিযুক্ত আতিকুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে কুবি শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মুস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, “বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে সমাধান করা হবে।”

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের প্রভোস্ট ড. ম. জনি আলম বলেন, “ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। হল প্রশাসনের কারও সম্পৃক্ততা থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে আলোচনা করে অভিযুক্ত বহিরাগতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য হটলাইন চালু

কুবিতে হল দখল ঘিরে ছাত্রদলের কোন্দল, নেতার ঘুষিতে কর্মীর নাক ফাটল, আহত ৩

আপডেট সময় : ০৪:০৮:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) আবাসিক হলে সিট দখল ও বহিরাগতদের অবৈধভাবে ওঠানোকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় অন্তত তিনজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, যার মধ্যে এক ছাত্রদল কর্মীর নাক ফেটে গেছে। গুরুতর আহত ওই কর্মীকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হল দখলের চেষ্টার সময় শাখা ছাত্রদলের এক যুগ্ম-আহ্বায়কসহ কয়েকজন নেতা-কর্মী নিজ দলের এক কর্মীর ওপর হামলা চালিয়ে তার নাক ফাটিয়ে দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের তৃতীয় তলার ছাদে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ঘটনার পরপরই হলে অবস্থানরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং হল প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

আহতরা হলেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের মাজহারুল ইসলাম আবির, অর্থনীতি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের তোফায়েল আহমেদ নিবিড় এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এআইএস) বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সৌরভ কাব্য। এদের মধ্যে সৌরভ কাব্যের নাকের হাড় ভেঙে গেছে বলে তার বন্ধুরা জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী এই তিন শিক্ষার্থীও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

অভিযুক্তরা হলেন কুবি শাখা ছাত্রদলের ৪ নম্বর যুগ্ম-আহ্বায়ক ও ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান, যুগ্ম-আহ্বায়ক ও একই শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের তরিকুল এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সিফাত।

আবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অভিযুক্ত আতিকুর রহমান হল কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে দত্ত হলের ৫০০২ নম্বর কক্ষে অবস্থান নেন এবং সেখানে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এক কর্মীকে তোলেন। একইভাবে ২০৪ নম্বর কক্ষে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রদল কর্মী সিফাতকে নিয়মবহির্ভূতভাবে রাখার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের (১৮তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীরা এতে আপত্তি জানান এবং হলের সিনিয়রদের অবহিত করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আতিকুর রহমান কয়েকজন অনাবাসিক শিক্ষার্থী ও কর্মীকে নিয়ে হলের বিভিন্ন কক্ষে যান এবং তাদের বিভিন্ন সিটে থাকার নির্দেশ দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মৌখিক বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়, যা রাতের দিকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানাতে গেলে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সদস্য সচিব মুস্তাফিজুর রহমান শুভর উপস্থিতিতেই আতিকুর রহমান তোফায়েল আহমেদ নিবিড়ের কলার ধরে চড় মারেন। এ সময় বাধা দিতে গেলে আবিরকে ধাক্কা দেওয়া হয় এবং সৌরভ কাব্যকে নাকে ঘুষি মারা হয়, এতে তার নাক ফেটে রক্তপাত শুরু হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হলের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা ছুটে এলে অভিযুক্তরা হল এলাকা থেকে পালিয়ে যান।

ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা হল প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং হল প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তোলেন। আবাসিক শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রদলের কিছু নেতা-কর্মী রাজনৈতিক পরিচয়ে অছাত্রদের হলের কক্ষে তোলার চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর একটি পক্ষ হল দখল ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজয় চব্বিশ হলসহ আরও কয়েকটি হলে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

আহত তোফায়েল আহমেদ নিবিড় বলেন, “আমরা ছাদে ছিলাম। এর মধ্যে ছাত্রদলের আতিক এসে আমার কলার ধরে চড় মারে। ১৭ ব্যাচের একজনের নাকে ঘুষি মেরে রক্ত বের করে দেয়। তাদের সঙ্গে সাইফুল, তরিক ও ১৮ ব্যাচের সিফাত নামের এক শিক্ষার্থী ছিল। তখন সৌরভের নাক ফেটে যায়। আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে আমার হাত মচকে যায়। আতিক আমার বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। সে আমাকে রাজনৈতিকভাবে মারধর করেছে।”

বহিরাগত হয়েও ছাত্রদলের প্রভাব খাটিয়ে হল দখলের চেষ্টা ও শিক্ষার্থীদের মারধরের বিষয়ে অভিযুক্ত আতিকুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে কুবি শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মুস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, “বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে সমাধান করা হবে।”

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের প্রভোস্ট ড. ম. জনি আলম বলেন, “ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। হল প্রশাসনের কারও সম্পৃক্ততা থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে আলোচনা করে অভিযুক্ত বহিরাগতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”