বাংলাদেশ কেবল একটি মানচিত্র বা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নাম নয়; এটি অগণিত প্রাণের ত্যাগ, সীমাহীন বেদনা আর সুতীব্র আকাঙ্ক্ষার ফসল। আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলমন্ত্রই ছিল মানবিক মর্যাদা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। তাই ‘ইনসাফের বাংলাদেশ’ কোনো রাজনৈতিক অলংকার নয়, বরং এটি এই জনপদের মানুষের অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদার এক মৌলিক দাবি।
একটি জাতির প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব তার আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সামরিক শক্তি কিংবা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে নির্ধারিত হয় না। বরং রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল ও প্রান্তিক নাগরিকের প্রতি কী ধরনের আচরণ করছে, তার মাধ্যমেই জাতির নৈতিক মানদণ্ড প্রতিফলিত হয়। যে রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত থাকে, সে রাষ্ট্র বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী মনে হলেও অভ্যন্তরীণভাবে অত্যন্ত ভঙ্গুর। ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায় নয়; এটি সভ্যতার ভিত্তি এবং বিবেকের প্রহরী। যেখানে ক্ষমতার দাপটে সত্যকে শ্বাসরোধ করা হয়, সেখানে রাষ্ট্র টিকে থাকলেও মানবিকতা হারিয়ে যায়। আমাদের প্রত্যাশা এমন এক বাংলাদেশের, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার স্বীয় মর্যাদায় মাথা উঁচু করে বাঁচবে এবং নির্ভয়ে সত্যের পথে অবিচল থাকবে।
পবিত্র কোরআনের সুরা নিসায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও; যদিও তা তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে যায়।’ এই অমোঘ বিধান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ন্যায়বিচার কোনো আপসের বিষয় নয়, বরং এটি মানবিকতা ও ঈমানের কঠিন পরীক্ষা। মানুষ জন্মগতভাবেই ন্যায়প্রিয়। একটি শিশুর বঞ্চনায় কেঁদে ওঠা কিংবা অবিচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে, ইনসাফ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আল-কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ন্যায় ও সদাচারের নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ এটিই আত্মার প্রশান্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলার মূল উৎস। ইতিহাস সাক্ষী, রোমান বা মোগলদের মতো প্রতাপশালী সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে কেবল ইনসাফহীনতার কারণে। অন্যায় কেবল ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজব্যবস্থাকে বিষাক্ত করে তোলে।
এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন যে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মেহনতি মানুষ, তারাই জাতির প্রকৃত প্রাণশক্তি। কিন্তু যখন এই মানুষগুলোই আইনি হয়রানি, ঘুষের থাবা কিংবা প্রশাসনিক বৈষম্যের শিকার হন, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়ে। একজন দরিদ্র মানুষ যখন দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বিচার পান না, তখন তিনি কেবল হতাশ হন না, বরং গোটা ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। আর যে জাতি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারায়, তার পতন অনিবার্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন যে, মজলুমের আর্তনাদ ও আল্লাহর মধ্যে কোনো আড়াল থাকে না।
অন্যায্যতা কেবল আইন ভঙ্গ করা নয়, এটি মানুষের আত্মসম্মানকে তিলে তিলে হত্যা করার শামিল। যখন একজন যোগ্য তরুণ সততার পথে বাধাগ্রস্ত হয় কিংবা একজন শ্রমজীবী মানুষ তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সমাজে অবিশ্বাস, হতাশা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে। এই তিনটি বিষই একটি জাতির সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ‘ইনসাফের বাংলাদেশ’ বলতে আমরা এমন এক রাষ্ট্রকে বুঝি, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে সত্যের শক্তি বেশি হবে। যেখানে একজন দিনমজুরও বিচারকের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়াতে পারবেন এবং পুলিশ হবে ভয়ের বদলে নিরাপত্তার প্রতীক। রাসুল (সা.)-এর বাণী অনুযায়ী, যে সমাজে দুর্বলের অধিকার শক্তিশালীর কাছ থেকে আদায় করা হয় না, সে জাতি কখনোই কল্যাণ লাভ করতে পারে না।
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেখলেও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, বিচারহীনতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো ক্ষতগুলো সমাজকে জর্জরিত করেছে। তবে সব সংকটের শেষেই থাকে নতুন সম্ভাবনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এ দেশের ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে যে পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তা আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করে।’
আমাদের আগামীর লক্ষ্য হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, ক্ষমতার জবাবদিহিতা এবং মানবিক অর্থনীতিই হবে এই নতুন বাংলাদেশের পরিচয়। যেখানে সম্পদ কেবল মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকবে না, বরং জাকাত, ওশর ও সামাজিক কল্যাণের মাধ্যমে তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হবে। সেই ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমেই আমাদের পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























