সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রাথমিক মূল্যায়নে জানিয়েছে ইলেকশন অবজারভার সোসাইটি (ইওএস)। সংস্থাটির পর্যবেক্ষকদের মতে, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও কোনো আসনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে এমন গুরুতর অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়নি। বরং, এটিকে একটি প্রকৃত নির্বাচন হিসেবেই অভিহিত করা হয়েছে।
শনিবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন হীরা এই দাবি করেন। তিনি সংস্থাটির পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
ইওএস তাদের বক্তব্যে জানায়, নির্বাচন আয়োজনের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়া গেলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে, যার ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করছিল। যদিও নির্বাচন কমিশন একাধিক ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে, কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পূর্বে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের সাথে পর্যাপ্ত আলোচনা না হওয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
বিশেষত, প্রতীকের অবস্থান পরিবর্তন, শাপলা প্রতীক অন্তর্ভুক্তির সময়কাল, পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ পদ্ধতি এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিধিনিষেধ সংক্রান্ত কিছু বিষয়ে পরবর্তীতে সংশোধন বা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ঋণখেলাপি ইস্যুসহ কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন কমিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বলেও মন্তব্য করা হয়।
ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কিছু অসামঞ্জস্যের কথাও তুলে ধরে ইওএস। সংস্থাটি জানায়, কোথাও নিচতলা ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও উপরের তলায় বুথ স্থাপন করায় বয়স্ক ও অসুস্থ ভোটারদের ভোগান্তি হয়েছে। সব কেন্দ্রে ভোটারের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়নি বলেও তারা মনে করে। রাজধানী ঢাকায় ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল, যা ভবিষ্যতে বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। এছাড়া, সরকারের ‘হ্যাঁ ভোট’ প্রচার সংক্রান্ত ব্যয় এবং শেষ মুহূর্তে কমিশনের নিষেধাজ্ঞা জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
কিছু প্রার্থীর আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রবণতা এবং পারস্পরিক ব্যক্তিগত আক্রমণের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নজরে এসেছে বলে জানায় ইওএস। নির্বাচনের আগের রাত পর্যন্ত গুজব ছড়ানো এবং কিছু স্থানে ভোট প্রভাবিত করার অপচেষ্টা থাকলেও তা সফল হয়নি এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সন্তোষজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীগুলো পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করেছে এবং সশস্ত্র বাহিনীর দৃঢ় অবস্থান শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। টানটান উত্তেজনার মধ্যেও প্রাণহানি ছাড়া নির্বাচন সম্পন্ন হওয়াকে একটি বড় অর্জন হিসেবে অভিহিত করা হয়।
ইওএস আরও জানায়, নারী ও তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততার ইতিবাচক প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে আলোচনাতেও প্রায় একই ধরনের মূল্যায়ন উঠে এসেছে বলে জানানো হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, সার্বিকভাবে এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি ইতিবাচক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য সংস্থাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে – ভোটকেন্দ্র নির্ধারণে আরও পরিকল্পিত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের সুবিধার্থে নিচতলায় বুথ স্থাপন, বয়সভিত্তিক ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনার বিষয় বিবেচনা, আচরণবিধি বাস্তবায়নে কঠোরতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সুষম সমন্বয় নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, পর্যবেক্ষকদের যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের বিষয়েও ভবিষ্যতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে, নির্বাচনের পরদিন কিছু স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জে প্রাণহানির ঘটনা এবং ফেনি ও টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন নির্বাচনোত্তর সহিংসতার তথ্যও পর্যবেক্ষকরা পেয়েছেন।
ইকবাল হোসেন বলেন, দেশব্যাপী সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এবং কোনো ধরনের অর্থায়ন ছাড়াই ইওএস মোট ২৯৯টি সংসদীয় আসনে পর্যবেক্ষক মোতায়েন করে নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করেছে। তারা তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন যথাসময়ে নির্বাচন কমিশনে জমা দেবেন এবং বর্তমান মূল্যায়নটি একটি সংক্ষিপ্ত সামগ্রিক চিত্র।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংস্থার প্রধান সমন্বয়কারী শহীদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আমিন, সহ-সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ প্রমুখ।
রিপোর্টারের নাম 






















