ঢাকা ০১:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

এমপিদের শপথ নিয়ে নানা আলোচনা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

## নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ: সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতার টানাপোড়েন

ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান নিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে কে শপথ পাঠ করাবেন, এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আইন মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট মহল দফায় দফায় বৈঠক করছে। যদিও সংসদ সচিবালয় শপথ অনুষ্ঠানের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, তবে সাংবিধানিক শূন্যতা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য এই প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে।

স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি ও সাংবিধানিক শূন্যতা:

দেশের সর্বোচ্চ আইন, সংবিধান অনুযায়ী সাধারণত বিদায়ী সংসদের স্পিকার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাবন্দী। এই পরিস্থিতিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি একটি সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি করেছে। এই শূন্যতা পূরণের জন্য রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা চলছে।

আইনি বিকল্প ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা:

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অক্ষমতায় রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাতে পারেন। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতিও শপথ পড়াতে পারেন বলে একটি মতামত এসেছে। তবে, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি শপথ পাঠ করাতে পারেন।

সংবিধানের ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশের তিনদিনের মধ্যে নির্ধারিত ব্যক্তি শপথ পাঠ করাতে ব্যর্থ হলে, পরবর্তী তিনদিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর এমনই এক পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করিয়েছিলেন। এবারও বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সিইসির কাছে শপথ নিতে পারেন বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও সরকারের অবস্থান:

বিজয়ী দল বিএনপি জানিয়েছে, তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কোনো লোকের কাছে শপথ নেবে না। এই রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকার বিজয়ী দল এবং বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করবে। অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আগ্রহী। তবে, রোজার আগে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন করার একটি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।

আইন মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা ও উপদেষ্টাদের বৈঠক:

আইন মন্ত্রণালয় দ্বাদশ সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকারের কারাবাসের কারণে সৃষ্ট জটিলতা দূর করতে দিনভর আলোচনা করেছে। সংবিধানে উল্লিখিত বিধান মেনে সিইসির মাধ্যমে শপথ অথবা সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির আলোকে অন্য কোনো বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলসহ কয়েকজন সিনিয়র উপদেষ্টা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। বৈঠকে অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুর রউফকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রধান উপদেষ্টা দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের শপথ ও ক্ষমতা হস্তান্তরের উপায় বের করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

ডেপুটি স্পিকারের জামিন ও আইনি বাধা:

শপথ গ্রহণের জন্য ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর জামিন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে, একজন কারাবন্দির মাধ্যমে শপথ পড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। টুকুর জামিনের বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এবং আদালতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। অন্যদিকে, পূর্বে সরকার তার জামিনের বিরোধিতা করায়, এখন পুনরায় জামিনের আবেদন করতেও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর যুক্তি দেখিয়ে জামিন আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর নাও করতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তুতি:

সংসদ সচিবালয় জাতীয় সংসদ ভবনকে সংস্কার করে অধিবেশন পরিচালনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রেখেছে। এমপি হোস্টেল, ন্যাম ভবন এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনও সংস্কার করা হয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন, সরকার যখন চাইবে, তখনই শপথ অনুষ্ঠান করা যাবে এবং তাদের পক্ষ থেকে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

বিএনপির সরকার গঠনের প্রত্যাশা:

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদের সরকার গঠন করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের এমন তথ্য জানানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

সব মিলিয়ে, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। দ্রুততম সময়ে এই জটিলতার নিরসন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সতর্কতা মার্কিন দূতাবাসের

এমপিদের শপথ নিয়ে নানা আলোচনা

আপডেট সময় : ০৮:৪৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ: সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতার টানাপোড়েন

ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান নিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে কে শপথ পাঠ করাবেন, এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আইন মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট মহল দফায় দফায় বৈঠক করছে। যদিও সংসদ সচিবালয় শপথ অনুষ্ঠানের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, তবে সাংবিধানিক শূন্যতা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য এই প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে।

স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি ও সাংবিধানিক শূন্যতা:

দেশের সর্বোচ্চ আইন, সংবিধান অনুযায়ী সাধারণত বিদায়ী সংসদের স্পিকার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাবন্দী। এই পরিস্থিতিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি একটি সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি করেছে। এই শূন্যতা পূরণের জন্য রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা চলছে।

আইনি বিকল্প ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা:

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অক্ষমতায় রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাতে পারেন। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতিও শপথ পড়াতে পারেন বলে একটি মতামত এসেছে। তবে, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি শপথ পাঠ করাতে পারেন।

সংবিধানের ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশের তিনদিনের মধ্যে নির্ধারিত ব্যক্তি শপথ পাঠ করাতে ব্যর্থ হলে, পরবর্তী তিনদিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর এমনই এক পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করিয়েছিলেন। এবারও বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সিইসির কাছে শপথ নিতে পারেন বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও সরকারের অবস্থান:

বিজয়ী দল বিএনপি জানিয়েছে, তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কোনো লোকের কাছে শপথ নেবে না। এই রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকার বিজয়ী দল এবং বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করবে। অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আগ্রহী। তবে, রোজার আগে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন করার একটি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।

আইন মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা ও উপদেষ্টাদের বৈঠক:

আইন মন্ত্রণালয় দ্বাদশ সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকারের কারাবাসের কারণে সৃষ্ট জটিলতা দূর করতে দিনভর আলোচনা করেছে। সংবিধানে উল্লিখিত বিধান মেনে সিইসির মাধ্যমে শপথ অথবা সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির আলোকে অন্য কোনো বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলসহ কয়েকজন সিনিয়র উপদেষ্টা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। বৈঠকে অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুর রউফকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রধান উপদেষ্টা দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের শপথ ও ক্ষমতা হস্তান্তরের উপায় বের করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

ডেপুটি স্পিকারের জামিন ও আইনি বাধা:

শপথ গ্রহণের জন্য ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর জামিন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে, একজন কারাবন্দির মাধ্যমে শপথ পড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। টুকুর জামিনের বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এবং আদালতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। অন্যদিকে, পূর্বে সরকার তার জামিনের বিরোধিতা করায়, এখন পুনরায় জামিনের আবেদন করতেও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর যুক্তি দেখিয়ে জামিন আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর নাও করতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তুতি:

সংসদ সচিবালয় জাতীয় সংসদ ভবনকে সংস্কার করে অধিবেশন পরিচালনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রেখেছে। এমপি হোস্টেল, ন্যাম ভবন এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনও সংস্কার করা হয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন, সরকার যখন চাইবে, তখনই শপথ অনুষ্ঠান করা যাবে এবং তাদের পক্ষ থেকে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

বিএনপির সরকার গঠনের প্রত্যাশা:

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদের সরকার গঠন করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের এমন তথ্য জানানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

সব মিলিয়ে, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। দ্রুততম সময়ে এই জটিলতার নিরসন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।