ঢাকা ০৪:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

ভারতের দ্বিতীয় দালাল জাতীয় পার্টির কবর

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:১৮:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

## জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক মৃত্যু: বৃহত্তর রংপুরেও লাঙ্গলের ভরাডুবি

ঢাকা: একদা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী দল হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির (জাপা) অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির এই করুণ দশার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে দলটির ঐতিহ্যবাহী শক্তিকেন্দ্র বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে। দেশের ২০০ আসনে প্রার্থী দিলেও একটিতেও জয়লাভ করতে না পারা জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক কবর রচিত হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রংপুর অঞ্চলে জাপার শোচনীয় পরাজয়

বৃহত্তর রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে ৩০টিতেই জাতীয় পার্টির প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। কিন্তু এই অঞ্চলের কোথাও তারা জয়লাভ করতে পারেনি। রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। এছাড়া, দুটি আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। মূলত, জামায়াত জোট এবং বিএনপির মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ ছিল। জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীক এই নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লার কাছে ধরাশায়ী হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান সংকট

১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি বৃহত্তর রংপুরে একচেটিয়া জয়লাভ করেছিল। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতেও দলটি তাদের এই আধিপত্য ধরে রেখেছিল। কিন্তু গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনী জোটে থাকার কারণে জাতীয় পার্টি ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর গভীর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ এবং ভারতের সঙ্গে সখ্যতার প্রভাব

আওয়ামী লীগ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের সঙ্গে জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের সখ্যতা দলটির রাজনৈতিক মৃত্যুতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় জাতীয় পার্টি সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছে। এরশাদের নিজভূমি হিসেবে পরিচিত বৃহত্তর রংপুরেও দলটির এই করুণ দশা প্রমাণ করে যে, তাদের চার দশকের ইতিহাসে এমন ভরাডুবি আগে কখনো হয়নি।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দুর্বলতা

দলটির অভ্যন্তরে চরম কোন্দলও এর অস্তিত্ব সংকটকে আরও গভীর করেছে। প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের ভাই জিএম কাদের, রওশন এরশাদ এবং আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মতো প্রভাবশালী নেতাদের আলাদা হয়ে যাওয়া দলটিকে দুর্বল করে দিয়েছে। বিগত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচন করার কারণে জাতীয় পার্টি নিজস্ব শক্তি হারিয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে মাত্র ১১টি আসন দিয়েছিল।

‘ভারতীয় দালাল’ তকমা ও জনগণে অবিশ্বাস

জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের ‘ভারতীয় দালাল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। ২০২৩ সালের আগস্টে ভারত সফরের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, ভারত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তার খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। ভারতের অনুমতি ছাড়া সফর সম্পর্কে কিছু বলা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এই প্রেক্ষাপটে, জিএম কাদেরের এই মন্তব্য ভারত বাংলাদেশে একটি ‘ভালো নির্বাচন’ দেখতে চায় এমন গুঞ্জনকে আরও জোরালো করে। যদিও জিএম কাদের পরবর্তীতে দাবি করেন যে, আওয়ামী লীগ তাকে নির্বাচন অংশগ্রহণে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করেছিল। তিনি দেশের স্বার্থে কাজ করছেন বললেও জনগণ তাকে এবং তার দলকে বিশ্বাস করেনি। ফলে, জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী জয়ী হতে পারেনি এবং তাদের অনেক প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এই ঘটনা জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিসিবির ‘ক্যাপ্টেনস কার্ড’: সাবেক ও বর্তমান অধিনায়কদের জন্য বিশেষ সম্মান ও চিকিৎসা সুবিধা

ভারতের দ্বিতীয় দালাল জাতীয় পার্টির কবর

আপডেট সময় : ০৭:১৮:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক মৃত্যু: বৃহত্তর রংপুরেও লাঙ্গলের ভরাডুবি

ঢাকা: একদা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী দল হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির (জাপা) অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির এই করুণ দশার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে দলটির ঐতিহ্যবাহী শক্তিকেন্দ্র বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে। দেশের ২০০ আসনে প্রার্থী দিলেও একটিতেও জয়লাভ করতে না পারা জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক কবর রচিত হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রংপুর অঞ্চলে জাপার শোচনীয় পরাজয়

বৃহত্তর রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে ৩০টিতেই জাতীয় পার্টির প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। কিন্তু এই অঞ্চলের কোথাও তারা জয়লাভ করতে পারেনি। রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। এছাড়া, দুটি আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। মূলত, জামায়াত জোট এবং বিএনপির মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ ছিল। জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীক এই নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লার কাছে ধরাশায়ী হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান সংকট

১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি বৃহত্তর রংপুরে একচেটিয়া জয়লাভ করেছিল। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতেও দলটি তাদের এই আধিপত্য ধরে রেখেছিল। কিন্তু গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনী জোটে থাকার কারণে জাতীয় পার্টি ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর গভীর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ এবং ভারতের সঙ্গে সখ্যতার প্রভাব

আওয়ামী লীগ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের সঙ্গে জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের সখ্যতা দলটির রাজনৈতিক মৃত্যুতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় জাতীয় পার্টি সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছে। এরশাদের নিজভূমি হিসেবে পরিচিত বৃহত্তর রংপুরেও দলটির এই করুণ দশা প্রমাণ করে যে, তাদের চার দশকের ইতিহাসে এমন ভরাডুবি আগে কখনো হয়নি।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দুর্বলতা

দলটির অভ্যন্তরে চরম কোন্দলও এর অস্তিত্ব সংকটকে আরও গভীর করেছে। প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের ভাই জিএম কাদের, রওশন এরশাদ এবং আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মতো প্রভাবশালী নেতাদের আলাদা হয়ে যাওয়া দলটিকে দুর্বল করে দিয়েছে। বিগত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচন করার কারণে জাতীয় পার্টি নিজস্ব শক্তি হারিয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে মাত্র ১১টি আসন দিয়েছিল।

‘ভারতীয় দালাল’ তকমা ও জনগণে অবিশ্বাস

জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের ‘ভারতীয় দালাল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। ২০২৩ সালের আগস্টে ভারত সফরের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, ভারত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তার খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। ভারতের অনুমতি ছাড়া সফর সম্পর্কে কিছু বলা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এই প্রেক্ষাপটে, জিএম কাদেরের এই মন্তব্য ভারত বাংলাদেশে একটি ‘ভালো নির্বাচন’ দেখতে চায় এমন গুঞ্জনকে আরও জোরালো করে। যদিও জিএম কাদের পরবর্তীতে দাবি করেন যে, আওয়ামী লীগ তাকে নির্বাচন অংশগ্রহণে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করেছিল। তিনি দেশের স্বার্থে কাজ করছেন বললেও জনগণ তাকে এবং তার দলকে বিশ্বাস করেনি। ফলে, জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী জয়ী হতে পারেনি এবং তাদের অনেক প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এই ঘটনা জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।