ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে দীর্ঘ এক দশক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গুনেছেন। এমনকি কবরের স্থানও এক প্রকার নির্ধারিত করে দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই অন্ধকার কনডেম সেল থেকে মুক্ত হয়ে সরাসরি জাতীয় সংসদে পা রাখছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে এক বিরল ও চাঞ্চল্যকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, তিনি ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৩৮ ভোট। প্রায় ৫৫ হাজার ভোটের বিশাল ব্যবধানে এই জয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এটিএম আজহারুল ইসলামের এই সংসদ সদস্য হওয়ার পথটি ছিল কণ্টকাকীর্ণ। ২০১২ সালের ২২ আগস্ট রাজধানীর মগবাজারের বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে মামলা করা হয় এবং ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। দীর্ঘ বছর কনডেম সেলে বন্দি অবস্থায় তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হন। ২০১৯ সালে আপিল বিভাগেও তার সাজা বহাল রাখা হয়েছিল। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকার তার ফাঁসি কার্যকরের যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এনেছিল।
তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। গত বছরের ২৭ মে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এটিএম আজহারুল ইসলামকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন। দীর্ঘ ১৩ বছরের কারাজীবন শেষে ২৮ মে তিনি মুক্তি পান। কারাগার থেকে মুক্তির মাত্র ৯ মাসের মাথায় জনগণের বিপুল রায়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন।
নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর আজহারুল ইসলামের বাসভবনে ভিড় জমান আনন্দিত নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটাররা। নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি একে মহান আল্লাহর অশেষ রহমত হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্ট সরকার আমার ফাঁসি কার্যকর করার সব প্রস্তুতি নিয়েছিল, এমনকি আমার কবরের জায়গা পর্যন্ত নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সম্ভবত মানুষের সেবার করার সুযোগ দিতে।”
তিনি আরও জানান, বিপুল ভোটের এই ব্যবধান তাকে দায়বদ্ধ করেছে। ধর্ম-বর্ণ ও দলমতনির্বিশেষে সবার প্রতিনিধি হিসেবে তিনি কাজ করতে চান। যারা তাকে ভোট দিয়েছেন এবং যারা দেননি—উভয় পক্ষের জন্যই সমানভাবে উন্নয়নের কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জের উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে এলাকার চেহারা বদলে দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য। জামায়াতের এই শীর্ষ নেতার এমন প্রত্যাবর্তনে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 
























