দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসন ও ভোটাধিকার হরণের কালো অধ্যায় পেরিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোট দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। আওয়ামী লীগ আমলের ‘নিশিরাত’ কিংবা ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনের কলঙ্কিত সংস্কৃতি ঝেড়ে ফেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের রায় জানিয়েছেন ভোটাররা। ভেঙে পড়া নির্বাচনী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের এই যাত্রায় এবারের নির্বাচনে দেখা গেছে এক অভাবনীয় চিত্র। একদিকে যেমন রাজনীতিতে নতুন ও স্বল্প পরিচিত মুখরা বিজয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছেন, তেমনি অন্যদিকে ধরাশায়ী হয়েছেন দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষ—বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর অনেক হেভিওয়েট ও আলোচিত নেতা। এমনকি কয়েকটি ছোট দলের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ হারিয়েছেন নিজেদের জামানতও। গত শুক্রবার পর্যন্ত ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ তিন নেতার পরাজয়। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর পরাজিত হয়েছেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও সাবেক বিসিবি সভাপতি মোহাম্মদ আলি আসগার লবির কাছে ২ হাজার ৭০২ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। লবি পেয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫৮ ভোট, আর পরওয়ারের প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫৬। একইভাবে কক্সবাজার-২ আসনে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বড় ব্যবধানে হেরেছেন বিএনপির আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের কাছে। সুনামগঞ্জ-২ আসনেও জামায়াতের আলোচিত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শিশির মনির বিএনপির নাছির চৌধুরীর কাছে প্রায় ৪০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।
রাজধানী ঢাকার লড়াইও ছিল বেশ নাটকীয়। ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের কাছে পরাজিত হয়েছেন জামায়াতের ডা. এস এম খালিদুজ্জামান। ঢাকা-৭ আসনে জামায়াতের এনায়েত উল্লাহকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন বিএনপির হামিদুর রহমান। তবে ঢাকা-১৪ আসনে চিত্র ছিল ভিন্ন; সেখানে জামায়াতের ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাসেম আরমান বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলিকে পরাজিত করেছেন। ঢাকা-১৩ আসনে আলোচিত আলেম মাওলানা মামুনুল হককে পরাজিত করে চমক দেখিয়েছেন বিএনপির ববি হাজ্জাজ।
জুলাই বিপ্লবের রাজপথ কাঁপানো তরুণ নেতাদের জন্যও ভোটের লড়াই ছিল বেশ কঠিন। ঢাকা-৮ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের কাছে মাত্র ৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। পঞ্চগড়-১ আসনেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর বিএনপির নওশাদ জমিরের কাছে ৮ হাজার ৩০৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ সারজিস আলম। এছাড়া ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়া তাসনিম জারা তৃতীয় অবস্থানে থেকে নির্বাচন শেষ করেছেন।
পরাজয়ের স্বাদ নিতে হয়েছে আরও অনেক প্রবীণ ও আলোচিত নেতাকে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে পরাজিত হয়েছেন জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন। পিরোজপুর-২ আসনে আল্লামা সাঈদীর বড় ছেলে শামীম সাঈদী পরাজিত হলেও তার ছোট ভাই মাসুদ সাঈদী পিরোজপুর-১ আসন থেকে বড় জয় পেয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা হারুনুর রশীদ হারুন পরাজিত হয়েছেন জামায়াতের নুরুল ইসলাম বুলবুলের কাছে। খুলনায় বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জুও জামায়াত প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন।
সবচেয়ে করুণ দশা দেখা গেছে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার। বগুড়া-২ আসনে তিনি মাত্র ৩ হাজার ৪২৬ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩টি আসনে প্রার্থী দিলেও একমাত্র বরগুনা-১ ছাড়া সব আসনেই তাদের প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন; যার মধ্যে দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীমও রয়েছেন। এছাড়া এবি পার্টির মজিবুর রহমান মঞ্জু, আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, গণঅধিকার পরিষদের সাবেক নেতা রাশেদ খান এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হকের মতো আলোচিত নেতারাও এই ব্যালট বিপ্লবে জয়ের দেখা পাননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে ভোটাররা কেবল দলের নাম বা পরিচিতি নয়, বরং প্রার্থীর যোগ্যতা ও স্থানীয় সমীকরণকে প্রাধান্য দিয়েছেন। হেভিওয়েটদের এই পতন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 
























