বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রকে ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, অতীতের ভুল ও শিক্ষা উভয়কেই কাজে লাগিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি গড়ে তুলতে চায় বিএনপি।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এসব কথা বলেন তিনি। সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় সম্প্রচারিত এই ভাষণে তারেক রহমান স্পষ্ট করেন যে, বিএনপি একটি জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনায় সমর্থন পেলে দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যতটা কঠোর হওয়া যায় বিএনপি সরকার ইনশাল্লাহ ততটাই কঠোর হবে। দেশে পুনরায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশবাসীর কাছে এটি আমার অঙ্গীকার।”
তারেক রহমান উল্লেখ করেন, দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের শাসনকালের পর দেশের মূল কাজ হবে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে বিএনপি একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি দেশবাসীকে কোনো উসকানিতে পা না দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতার আহ্বান জানান। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, অতীতের অপশাসন বা সহিংসতার পুনরাবৃত্তি বিএনপি করবে না। শুধু ফাঁকা বুলি না দিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তাঁর ভাষণে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রাধান্য পায়: সংস্কার ও পরিবর্তন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার এবং বেকারত্ব ও তারুণ্যের প্রত্যাশা। দীর্ঘ দেড় দশক পর মানুষ তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান সবাইকে ভোটদানের আহ্বান জানান এবং এটিকে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানানোর উপায় বলে অভিহিত করেন।
নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দেশজুড়ে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও তিনি তুলে ধরেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে নাগরিক মূল্যায়ন এবং সকল ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি বলেন, এই শুভ সময় অর্জনের জন্য বিএনপি সহ গণতন্ত্রের পক্ষের সকল রাজনৈতিক দল এবং জনগণ দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। এই আন্দোলনে বহু মানুষকে গুম-খুন ও অপহরণের শিকার হতে হয়েছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ৩০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান। দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত এবং আহতদের প্রতি তিনি সমবেদনা জানান।
দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রতিটি সেক্টর এবং শ্রেণি-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এই ইশতেহার চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে, তরুণ-তরুণী, বেকার জনগোষ্ঠী এবং নারীদের জন্য দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পর্যায়ক্রমে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য তিনি বলেন, কয়েকটি নির্দিষ্ট সেক্টরকে চিহ্নিত করে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির উপায় ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশব্যাপী কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে বেকার জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা হবে। কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনামূল্যে স্কিলস ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং এবং আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে, যা তরুণ-তরুণীদের উচ্চ বেতনের চাকরির জন্য প্রস্তুত করবে এবং সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে সহায়তা করবে।
—
রিপোর্টারের নাম 
























