ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারই দেশের প্রধান ও মৌলিক প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেছেন, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সোমবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
ভাষণের শুরুতে মাওলানা মামুনুল হক মহান মুক্তিযুদ্ধ, শাপলা চত্বর, পিলখানা ট্র্যাজেডি এবং জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন সময়ে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের একক সম্পত্তি নয়, বরং এটি শ্রমিক, কৃষক, নারী-পুরুষ, পাহাড়ি-সমতলের সব মানুষের সম্মিলিত আবাসভূমি। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দুর্নীতি, জুলুম এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
মামুনুল হক তার ভাষণে একটি কল্যাণরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলেন, রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত কল্যাণমুখী হতে পারে যখন আইন সবার জন্য সমান হবে, ক্ষমতাকে আমানত হিসেবে গণ্য করা হবে এবং দুর্নীতি, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র আপসহীন অবস্থান নেবে। গত ১৬ বছরে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ভোটাধিকার হরণ ও অর্থনৈতিক লুটপাটের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, দেশের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি আমূল রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তন।
রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে মাওলানা মামুনুল হক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে একটি স্বাধীন ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, প্রশাসনকে রাজনীতিমুক্ত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ।
তরুণ সমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। উদ্যোক্তা তৈরি, দেশীয় শিল্পের প্রসার এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। নারীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ, হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার কথা বলেন। কৃষক, শ্রমিক ও প্রবাসীদের জন্য আলাদা সেবা কাঠামো, ন্যায্য মূল্য, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রসঙ্গে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, প্রতিটি নাগরিক নিজ নিজ ধর্ম পালনে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। তবে ধর্মের নামে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে না।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির জানান, জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে তার দল ১১ দলীয় নির্বাচনি সমঝোতার অংশ হিসেবে ২৬টি আসনে ‘রিকশা’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং অন্যান্য আসনে মিত্র দলগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে। তিনি দেশবাসীর প্রতি ভয়মুক্তভাবে, বিবেকের তাড়নায় এবং ইনসাফের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। ভাষণের শেষে তিনি বলেন, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণের নির্বাচন। আসুন, বাংলাদেশকে তার প্রকৃত মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিই।
রিপোর্টারের নাম 
























