ঢাকা ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

লালমনিরহাটে সারের সিন্ডিকেট: দ্বিগুণ দামে বিক্রি, কৃষকদের হাহাকার

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৪:১১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সারের বাজার সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সার ডিলারদের গুদামে না মিললেও, খুচরা বাজারে সেই সারই বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। এই কৃত্রিম সংকটের কারণে রবি মৌসুমের চাষাবাদে কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। একদিকে চড়া মূল্যে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা, অন্যদিকে ভেজাল সারের রমরমা কারবারে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ চাষিরা।

বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, আলুসহ অন্যান্য ফসল রোপণের জন্য প্রয়োজনীয় টিএসপি সার না পেয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলারদের কাছে গেলে সরাসরি ‘সার নেই’ বলে জানানো হচ্ছে। অথচ, পার্শ্ববর্তী খুচরা দোকানগুলোতে প্রতি বস্তা টিএসপি সার ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

ভেলাবাড়ি এলাকার এক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আলু রোপণের জন্য টিএসপি সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে কিনেছি। ডিলাররা গুদাম থেকে গোপনে সার বাইরে বিক্রি করে দেয়, আর আমাদের বলে বরাদ্দ নেই।”

কৃষকদের অভিযোগের তীর উপজেলা কৃষি অফিসের তদারকির দিকেও। নিয়ম অনুযায়ী, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া এবং সারের বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তাদের কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়ছে না। অভিযোগ রয়েছে, তারা কেবল ডিলারদের রেজিস্টার খাতায় স্বাক্ষর করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছেন। এই সুযোগে অসাধু ডিলাররা সার মজুত করে কালোবাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে। কোনো কৃষক অনিয়মের অভিযোগ করলে কৃষি কর্মকর্তারা দায় চাপান প্রশাসনের ওপর, দাবি করেন যে সহকারী কমিশনার ছাড়া অভিযান চালানো সম্ভব নয়। প্রশাসন ও কৃষি অফিসের এই সমন্বয়হীনতার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা ফুলেফেঁপে উঠছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত অভিযান ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কৃষকরা বলছেন, এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘ বিরতিতে দু-একটি নামমাত্র অভিযান পরিচালনা করা হলেও মূল হোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ছোটখাটো খুচরা বিক্রেতাদের সামান্য জরিমানা করেই প্রশাসন দায় সারছে। কৃষকদের মতে, এসব অভিযান কেবল ‘লোক দেখানো’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইখুল আরেফিন জানান, বাজারে সারের কোনো সংকট নেই। তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন—যদি সংকট না-ই থাকে, তাহলে কেন কৃষকদের দ্বিগুণ দামে সার কিনতে হচ্ছে? সার সংকটের আড়ালে নকল ও নিম্নমানের সারের কারবারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন কৃষকরা। ভেজাল সার ব্যবহারের ফলে ফসলি জমি ও বীজতলা মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্য উৎপাদনের জন্য একটি বড় হুমকি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বায়ুদূষণ রোধে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী চীন, পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের বৈঠক

লালমনিরহাটে সারের সিন্ডিকেট: দ্বিগুণ দামে বিক্রি, কৃষকদের হাহাকার

আপডেট সময় : ০৯:৫৪:১১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সারের বাজার সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সার ডিলারদের গুদামে না মিললেও, খুচরা বাজারে সেই সারই বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। এই কৃত্রিম সংকটের কারণে রবি মৌসুমের চাষাবাদে কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। একদিকে চড়া মূল্যে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা, অন্যদিকে ভেজাল সারের রমরমা কারবারে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ চাষিরা।

বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, আলুসহ অন্যান্য ফসল রোপণের জন্য প্রয়োজনীয় টিএসপি সার না পেয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলারদের কাছে গেলে সরাসরি ‘সার নেই’ বলে জানানো হচ্ছে। অথচ, পার্শ্ববর্তী খুচরা দোকানগুলোতে প্রতি বস্তা টিএসপি সার ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

ভেলাবাড়ি এলাকার এক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আলু রোপণের জন্য টিএসপি সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে কিনেছি। ডিলাররা গুদাম থেকে গোপনে সার বাইরে বিক্রি করে দেয়, আর আমাদের বলে বরাদ্দ নেই।”

কৃষকদের অভিযোগের তীর উপজেলা কৃষি অফিসের তদারকির দিকেও। নিয়ম অনুযায়ী, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া এবং সারের বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তাদের কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়ছে না। অভিযোগ রয়েছে, তারা কেবল ডিলারদের রেজিস্টার খাতায় স্বাক্ষর করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছেন। এই সুযোগে অসাধু ডিলাররা সার মজুত করে কালোবাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে। কোনো কৃষক অনিয়মের অভিযোগ করলে কৃষি কর্মকর্তারা দায় চাপান প্রশাসনের ওপর, দাবি করেন যে সহকারী কমিশনার ছাড়া অভিযান চালানো সম্ভব নয়। প্রশাসন ও কৃষি অফিসের এই সমন্বয়হীনতার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা ফুলেফেঁপে উঠছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত অভিযান ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কৃষকরা বলছেন, এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘ বিরতিতে দু-একটি নামমাত্র অভিযান পরিচালনা করা হলেও মূল হোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ছোটখাটো খুচরা বিক্রেতাদের সামান্য জরিমানা করেই প্রশাসন দায় সারছে। কৃষকদের মতে, এসব অভিযান কেবল ‘লোক দেখানো’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইখুল আরেফিন জানান, বাজারে সারের কোনো সংকট নেই। তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন—যদি সংকট না-ই থাকে, তাহলে কেন কৃষকদের দ্বিগুণ দামে সার কিনতে হচ্ছে? সার সংকটের আড়ালে নকল ও নিম্নমানের সারের কারবারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন কৃষকরা। ভেজাল সার ব্যবহারের ফলে ফসলি জমি ও বীজতলা মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্য উৎপাদনের জন্য একটি বড় হুমকি।