দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটাররাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন, যা অতীতের সব হিসাব পাল্টে দিতে পারে।
দীর্ঘদিন পর সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে ঘিরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ জেলার ১৬টি সংসদীয় আসনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাঁদের মতে, নির্বাচনের ফল নির্ধারণে মূল প্রভাবক হিসেবে আবির্ভূত হবেন তরুণ ও নারী ভোটাররা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এ বছর মোট ভোটার সংখ্যা ৬৬ লাখ ৮২ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার নতুন ভোটার রয়েছেন, যাদের সিংহভাগই তরুণ। পাশাপাশি মোট ভোটারের প্রায় ৪৭ শতাংশ নারী, যাদের সংখ্যা ৩২ লাখের বেশি। এই বিপুলসংখ্যক তরুণ ও নারী ভোটারদের সম্মিলিত শক্তি এবারের নির্বাচনি সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
বিগত তিনটি নির্বাচনে ভোটদানে বিরত থাকা বিপুলসংখ্যক তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ ভোটাররাই সবচেয়ে বড় প্রভাবক হয়ে উঠেছেন। অতীতের কিছু বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে ভোটকেন্দ্রবিমুখ ছিলেন তরুণদের বড় একটি অংশ। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। তারা পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চট্টগ্রাম-১০ আসনের তরুণ ভোটার জিহান চৌধুরী বলেন, ‘যারা জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করবে, আমরা তাদেরই ভোট দেব। এই জুলাইয়ের জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি। আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে।’ বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আর্শ্চাযী প্রার্থীর দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত ইমেজকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হোসেন আতিকের স্পষ্ট ঘোষণা, ‘ঋণখেলাপি, টাকা পাচারকারী বা দুর্নীতিবাজ কাউকে আমরা ভোট দেব না।’ চট্টগ্রাম-৪ আসনের ভোটার রাহাতুল ইসলামের প্রত্যাশা, ‘জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছি। আশা করছি এবার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হবে।’
অন্যদিকে, নারী ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণও এবারের নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীর আত্মীয় হিসেবে অথবা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘরে ঘরে গিয়ে নারী প্রচারকরা ভোট চাইছেন। অনেকেই আবার গণভোটের পক্ষেও প্রচারণায় যুক্ত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের পাশাপাশি নারীরাও এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন। বোয়ালখালীর নারী ভোটার অর্পিতা দাশ বলেন, ‘যিনি নারীদের উন্নয়নে গুরুত্ব দেবেন, নারীদের ঘরে বন্দি না রেখে জাতীয় স্বার্থে সব জায়গায় সম্পৃক্ত করবেন, আমরা তাকেই ভোট দেব।’ চট্টগ্রাম-৪ আসনের উত্তর কাট্টলী এলাকার পোশাকশ্রমিক জিন্নাত হোসেনের দাবি, ‘যিনি নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, জীবনমান উন্নয়ন ও নিত্যপণ্যের দাম কমাতে কাজ করবেন, তাকেই ভোট দেব।’
বিষয়টি মাথায় রেখে প্রার্থীরাও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পাড়া-মহল্লায় নিবিড় প্রচার চালাচ্ছেন। অনেক আসনে প্রার্থীদের স্ত্রী, বোন ও মেয়েরা সরাসরি নারী ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন এবং ঘরোয়া সভায় অংশ নিচ্ছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামে শুধু নতুন ভোটারই নন, আগের ভোটারদের বড় অংশও তরুণ। তারা গৎবাঁধা রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, ইশতেহার ও বাস্তবায়নযোগ্যতা বিবেচনা করেই তারা ভোট দেবেন। ৫ আগস্টের পর মানুষ পরিবর্তন চায়। যারা সে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবেন, তরুণরা তাদেরই বেছে নেবেন।’
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রামে পুরুষ ভোটার প্রায় ৩৫ লাখ এবং নারী ভোটার ৩২ লাখ। নারী ভোটারের হার ৪৭.৮৬ শতাংশ। নতুন ভোটার মোট ভোটারের প্রায় ৫ শতাংশ। জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে ১১টিতে ভোটার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার করে বেড়েছে। এর মধ্যে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে সবচেয়ে বেশি ভোটার বৃদ্ধির রেকর্ড করা হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে প্রায় ৭ হাজার ভোটার কমেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইপিজেড এলাকায় চাকরির কারণে ভোটার স্থানান্তরের ফলেই এই হ্রাস ঘটেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এবার দলীয় প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, সততা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই বেশি গুরুত্ব পাবে। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও জেলার নির্বাচনি এলাকাগুলোতে নারী ও তরুণ ভোটাররা সে বিবেচনাতেই ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 























