ডায়াবেটিস ধরা পড়লেই অনেকে খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান, মনে করেন জীবন থেকে অনেক কিছুই বাদ দিতে হবে। তবে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মূল বিষয় হলো খাবারকে অস্বীকার করা নয়, বরং সঠিক খাবার নির্বাচন, পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। বিভিন্ন ধরনের খাবারই খাদ্যতালিকায় রাখা সম্ভব, তবে কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাদ্য ব্যবস্থাপনার তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো:
১. বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস:
প্রতিদিন একই ধরনের খাবার না খেয়ে খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন রঙ ও স্বাদের খাবার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি, ফলমূল এবং পরিমিত পরিমাণে শ্বেতসার-জাতীয় খাবার যেমন— লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, বা আলু গ্রহণ করলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
২. সময়ানুবর্তিতা:
খাবারের সময় ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার— কোনো বেলার খাবারই বাদ দেওয়া উচিত নয়। নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেলে রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় থাকে।
৩. পরিহার বা সীমিতকরণ:
চিনি: সরাসরি চিনি, মিষ্টি, কোমল পানীয় এবং উচ্চ গ্লাইসেমিক সূচকযুক্ত খাবার যেমন— ময়দা, সাদা চালের ভাত, আলু— এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, তাই এগুলো বর্জন করা আবশ্যক।
লবণ: দৈনিক চাহিদার অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই আলাদা লবণ বা কাঁচা লবণ খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
চর্বি: স্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ খাবার যেমন— লাল মাংস, ফাস্ট ফুড এবং ট্রান্স-ফ্যাটযুক্ত ভাজা খাবার কমিয়ে আনা প্রয়োজন। রান্নার জন্য অলিভ অয়েল, সয়াবিন বা সানফ্লাওয়ার অয়েলের মতো স্বাস্থ্যকর চর্বি অল্প পরিমাণে ব্যবহার করা যেতে পারে।
শ্বেতসার-সমৃদ্ধ খাবারের সঠিক নির্বাচন:
শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন শ্বেতসার-সমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, চাপাতি, এবং খোসাসহ সেদ্ধ বা বেক করা মিষ্টি আলু।
প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবারের গুরুত্ব:
পেশি গঠন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রোটিন অপরিহার্য। ডিম, মাছ ও মাংস প্রোটিনের ভালো উৎস। তবে লাল মাংস (গরু, খাসি, ভেড়া) এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস (সসেজ, সালামি) হৃদরোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়ায় এদের পরিমাণ সীমিত রাখা উচিত। স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উৎসের মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ (ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ), ডাল, শিম, বরবটি, অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার, বাদাম ও বীজ। নিরামিষাশী ও ভেগানদের জন্য এই খাবারগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রোটিন গ্রহণের সহজ উপায়:
নাস্তায় এক মুঠ বাদাম, মাংস বা রান্নায় ডাল বা শিম ব্যবহার, সেদ্ধ, পোচ বা অল্প তেলে ভাজা ডিম, গ্রিল বা বেক করা মাছ ও মাংস— এগুলো প্রোটিন গ্রহণের সহজ ও স্বাস্থ্যকর উপায়।
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার:
দুধ, দই এবং পনির হাড়, দাঁত ও পেশির জন্য ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের নির্ভরযোগ্য উৎস। তবে কিছু দুগ্ধজাত খাবারে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে যা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে। তাই কম চর্বিযুক্ত এবং অতিরিক্ত চিনিমুক্ত বিকল্প বেছে নেওয়া উচিত। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণ প্রয়োজন।
উপযোগী দুগ্ধজাত খাবার:
এক গ্লাস দুধ, ওটস বা সিরিয়ালের সাথে দুধ, ফল বা সবজির সাথে টক দই, গাজর ও শসার সাথে পনির, এবং সন্ধ্যার নাস্তায় টক দই— এগুলো ডায়াবেটিস রোগীর জন্য উপযোগী।
চর্বি ও তেলের সঠিক ব্যবহার:
ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্যতালিকায় চর্বি থাকা জরুরি, তবে স্যাচুরেটেড ফ্যাট খুব সীমিত রাখতে হবে। মাখন, নারিকেল তেল, পাম অয়েল— এগুলোতে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে। এর পরিবর্তে অলিভ অয়েল, অন্যান্য ভেজিটেবল অয়েল, এবং বাদাম থেকে তৈরি বাটার (পিনাট বাটার, আমন্ড বাটার) স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফল ও সবজির প্রয়োজনীয়তা:
ডায়াবেটিস থাকলেই ফল খাওয়া যাবে না—এমন ধারণা ভুল। ফল ও শাকসবজি ভিটামিন, খনিজ ও আঁশে ভরপুর। কম মিষ্টিযুক্ত ফল বা সিজনাল ফল প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে ফলের জুস ও স্মুদি এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ এগুলোতে ফাইবার কম থাকায় খুব দ্রুত রক্তের শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। জুস তৈরিতে বেশি ফল ব্যবহারের ফলে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরি গ্রহণ করা হয়, যা সুগার নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করে।
রিপোর্টারের নাম 




















